একটি অর্থনীতির কার্যক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে তার অবকাঠামোর ওপর। সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগ—এসব ব্যবস্থা মানুষের চলাচল ও ব্যবসার কার্যক্রম সহজ করার পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু অবকাঠামো তৈরি করার পর সেটি সচল রাখার দায়িত্ব উপেক্ষিত হলে নতুন নির্মাণও একসময় অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান অবস্থা সেই বিপদেরই প্রতিচ্ছবি। অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকার করা হলেও বাস্তবে পুরোনো সম্পদের ক্ষয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির সব খাত মিলিয়ে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি আনুমানিক ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন র্যান্ডে পৌঁছেছে। শুধু সড়কব্যবস্থার পুরোনো ঘাটতি কাটাতে প্রয়োজন প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন র্যান্ড।
সমস্যাটি শুধু অর্থের নয়
রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি বাড়ার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সময়ের সঙ্গে এর আর্থিক মূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়া। একটি রাস্তা, পানির লাইন বা বিদ্যুৎ স্থাপনা সময়মতো মেরামত করা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের কাজ। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলার পর একই সম্পদ পুনর্গঠন করতে গেলে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার সড়কব্যবস্থা এর স্পষ্ট উদাহরণ। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ সড়ক তাদের নির্ধারিত ২০ বছরের নকশাগত আয়ু অতিক্রম করেছে। প্রাদেশিক সড়কের প্রায় ৩০ শতাংশ খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। ফলে মেরামতের ব্যয় শুধু সরকারি বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করছে না; পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
পানি খাতে বছরে প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন র্যান্ড এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো সচল রাখতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন র্যান্ড প্রয়োজন। পৌর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণেও বছরে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন র্যান্ডের ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ সংকটটি কোনো একটি খাতের বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দুর্বলতার ফল।
রাজনীতি যখন রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে নির্মাণকে পুরস্কৃত করে
অবকাঠামো খাতে অর্থের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই বাস্তব। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে আরও গভীর একটি সমস্যা—রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের অসামঞ্জস্য।
নতুন প্রকল্প দৃশ্যমান। উদ্বোধন করা যায়, প্রচার করা যায় এবং রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা যায়। বিপরীতে একটি পুরোনো পানি সরবরাহব্যবস্থা সময়মতো মেরামত করা কিংবা একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সক্ষমতা ধরে রাখা সাধারণত একই ধরনের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা তৈরি করে না।
ফলে অবকাঠামো নীতিতে নতুন নির্মাণ অনেক সময় রক্ষণাবেক্ষণকে ছাড়িয়ে যায়। এর ফল হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নতুন সম্পদ তৈরি হচ্ছে, অথচ পুরোনো সম্পদ ক্রমাগত অবমূল্যায়িত হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয়, প্রাদেশিক ও পৌর সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা। কোথাও স্থানীয় পানি নেটওয়ার্ক তৈরি হলেও পর্যাপ্ত মূল সরবরাহব্যবস্থা নেই। কোথাও বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে তার সমন্বয় নেই। এতে সরকারি বিনিয়োগের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফল দিতে পারে না।

দক্ষতার ঘাটতিও সংকটকে গভীর করছে
দক্ষ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ পেশাজীবী। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ ২৫৭টি পৌরসভায় এমন দক্ষতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়।
আরেকটি বড় দুর্বলতা তথ্যের ঘাটতি। কোনো অবকাঠামোর অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কোন সম্পদ আগে সংস্কার করা দরকার, কোথায় বিনিয়োগ জরুরি এবং কোথায় ব্যর্থতার ঝুঁকি বেশি—তা নির্ধারণ করা কঠিন। প্রায় ১৮ শতাংশ সড়কের অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার বিষয়টি এই সমস্যার গভীরতা বোঝায়।
এ কারণে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এখন অপরিহার্য। পৌরসভাগুলোর এমন তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন, যা অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা নিয়মিত পরিমাপ করবে এবং সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগেই রক্ষণাবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
রক্ষণাবেক্ষণকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে
দক্ষিণ আফ্রিকার নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে রক্ষণাবেক্ষণের ধারণাগত অবস্থান বদলানো। এটিকে ঐচ্ছিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করলে ঘাটতি কখনো শেষ হবে না। বিদ্যমান সম্পদের জীবনচক্র ধরে পরিকল্পনা করতে হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ আলাদা রাখতে হবে।
পানি, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে পাওয়া পৌর রাজস্ব পুনরায় অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য সংরক্ষিত রাখার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে পরিষেবা থেকে আয় এবং অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে একটি কার্যকর আর্থিক সম্পর্ক তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়তে পারে।
সরকারি অনুদান ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু নতুন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার ওপর সাফল্য নির্ভর করা উচিত নয়। কোন অবকাঠামো কতদিন কার্যকর থাকল, পরিষেবার মান কতটা উন্নত হলো এবং সম্পদের আয়ু কতটা বাড়ানো গেল—এসব ফলাফলকেও অর্থ বরাদ্দের ভিত্তি করতে হবে।

পরিকল্পনাকে নির্বাচনী চক্রের বাইরে নিতে হবে
দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাহিদার সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু অবকাঠামোর আয়ু কয়েক দশক হতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রায়ই কয়েক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
এই ব্যবধান কমাতে স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের প্রয়োজন। কোন প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে কতটা দৃশ্যমান, তার বদলে তার অর্থনৈতিক সুফল, সম্পদের অবস্থা, জনসেবার প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় বিবেচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে জাতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ের অবকাঠামো পরিকল্পনাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। বড় সরবরাহব্যবস্থা এবং স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক আলাদা পরিকল্পনায় পরিচালিত হলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমে যায়।
স্থানীয় সরকারকে আরও দক্ষ করতে হবে
পৌরসভাগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। তাদের নিজস্ব প্রকৌশল ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ জনবল ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক, প্রশিক্ষণ এবং স্পষ্ট পেশাগত উন্নতির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে নতুন প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের স্থানীয় সরকারে যুক্ত করা যেতে পারে। বিশেষায়িত কিছু কাজের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের দক্ষতাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অবকাঠামো সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বেসরকারি অর্থ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পেনশন তহবিল, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন অর্থায়নকারী সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে কাজে লাগাতে হলে আগে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতাও একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকলে পুরো অর্থনীতি তার মূল্য দেয়।

জনগণকেও অবকাঠামোর অংশীদার করতে হবে
অবকাঠামো রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কোনো প্রকল্পের মালিকানাবোধ তৈরি না হলে সেটি ভাঙচুর, অব্যবস্থাপনা কিংবা অবহেলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তাই স্থানীয় সম্প্রদায়কে শুধু পরিষেবার গ্রহীতা হিসেবে দেখলে চলবে না। অবকাঠামোর পরিকল্পনা, ব্যবহার এবং সংরক্ষণে তাদের অংশীদার করতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে এখন একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের সময়। দেশটি কি পুরোনো অবকাঠামো ক্ষয়ে যেতে দিয়ে নতুন প্রকল্প নির্মাণের ধারাকে অব্যাহত রাখবে, নাকি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দর্শন বদলে প্রতিটি অবকাঠামোর পূর্ণ জীবনচক্রকে গুরুত্ব দেবে?
রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি পূরণে ব্যয় অবশ্যই বিপুল। কিন্তু কিছু না করার মূল্য আরও বেশি। আজ যে সম্পদ সামান্য রক্ষণাবেক্ষণে সচল রাখা সম্ভব, কাল সেটিই সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণের দাবি করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো প্রয়োজন—এ কথা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা যে অবকাঠামো তৈরি করি, সেটি কতদিন কার্যকর রাখতে পারি। নতুন সড়ক বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির প্রকৃত ভিত্তি হলো এমন অবকাঠামো, যা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ পায় এবং অর্থনীতিকে প্রতিদিন তার পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে সাহায্য করে।











