একটি কলম দেখতে যতটা সাধারণ, মানবসভ্যতার ইতিহাসে তার ভূমিকা ততটাই অসাধারণ। যুদ্ধ, সাহিত্য, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে কলম ইতিহাসের গতিপথ বদলেছে। অথচ ইতিহাসের পাতায় কলম নিজেই যেন বারবার আড়ালে থেকে গেছে।
সাংবাদিক ও লেখক সাইমন গারফিল্ডের নতুন বই The Pen সেই বিস্মৃত ইতিহাসকেই সামনে এনেছে। বইটিতে কলমকে শুধু লেখার একটি সরঞ্জাম হিসেবে নয়, বরং মানুষের অগ্রযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। লেখকের মতে, চাকা, বাষ্পীয় ইঞ্জিন কিংবা মাইক্রোচিপের মতোই কলমও সভ্যতার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে কলমের অবিশ্বাস্য ভূমিকা
কলমের ইতিহাস যে কতটা নাটকীয় হতে পারে, তার একটি ঘটনা ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৪ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের মেত্জ শহরের কাছে।
জার্মান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সময় এক মার্কিন সেনার শ্বাসনালি জার্মান মর্টারের একটি টুকরোয় আটকে যায়। তিনি প্রচণ্ড কষ্টে ছটফট করছিলেন এবং শ্বাস নিতে পারছিলেন না। সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। নিজের ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করে এবং পরে ছুরি দিয়ে অস্ত্রোপচারের মতো একটি ব্যবস্থা করে ওই সেনার শ্বাসনালি খুলে দেন। ফলে তিনি আবার শ্বাস নিতে সক্ষম হন।
এই ঘটনাটি কলমকে ঘিরে তৈরি হওয়া বহু কিংবদন্তির একটি উদাহরণ। কলম শুধু লিখে রাখে না, কখনো কখনো মানুষের জীবনও রক্ষা করতে পারে—এই ঘটনাটি সেই অদ্ভুত বাস্তবতাই সামনে আনে।
ইতিহাস লেখে কলম, অথচ ইতিহাসে কলমই অনুপস্থিত
কলমের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। এটি ইতিহাস তৈরি করেছে, কিন্তু নিজের ইতিহাস খুব কমই লিখেছে।
প্রাচীন লেখার সরঞ্জাম ছিল আজকের কলমের মতো নয়। চীনের তাং রাজবংশের কবিরা ব্রাশ ব্যবহার করতেন। রোমান দার্শনিক সিসেরো চিঠি লিখতেন খাগের কলমে। জুলিয়াস সিজার স্টাইলাস ব্যবহার করতেন। সেটি ছিল পেরেকের মতো লম্বা ও সূচালো একটি সরঞ্জাম।
আধুনিক অর্থে কলমের জন্ম অনেক পরে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি ছিল পালকের কলম বা কুইল। ল্যাটিন penna শব্দের অর্থই ছিল পালক, যেখান থেকে ইংরেজি pen শব্দটির উৎপত্তি।
এই কুইলই একসময় ইউরোপের লেখালেখির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। শেক্সপিয়র তাঁর নাটক লিখেছেন কুইল দিয়ে। ম্যাগনা কার্টায় স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও কুইল ব্যবহারের কথা বলা হয়। বিটোফেনের বিখ্যাত পঞ্চম সিম্ফনির খসড়াও তৈরি হয়েছিল এমন কলমে।
কিন্তু কুইল ব্যবহার করা মোটেও সহজ ছিল না। কালি চুইয়ে পড়ত, নিব ভেঙে যেত এবং বারবার সেটিকে ছেঁটে ঠিক করতে হতো। একজন ব্যস্ত লেখক দিনে পাঁচটি পর্যন্ত কুইল ব্যবহার করে ফেলতে পারতেন।
এতে শুধু লেখকদেরই দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি, হাঁস ও রাজহাঁসেরও বড় ক্ষতি হয়েছে। ১৮৩২ সালে শুধু ইংল্যান্ডেই প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ রাজহাঁসের পালক আমদানি করা হয়েছিল, যার বড় অংশ এসেছিল নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি থেকে।
কুইল থেকে ফাউন্টেন পেন
কলমকে আরও টেকসই করার চিন্তা থেকেই আসে ফাউন্টেন পেনের ধারণা—যেখানে কলমের ভেতরেই কালি রাখা যায় এবং ধাতব নিব দিয়ে লেখা যায়।
তবে ফাউন্টেন পেনের প্রকৃত উদ্ভাবন নিয়ে নিশ্চিত ইতিহাস নেই। ১৮২৭ সালে ফ্রান্সে এমন একটি কলম তৈরির ধারণা পাওয়া যায়। আবার কেউ এর কৃতিত্ব দেন ১৮৬৭ সালের আইওয়াকে, কেউ আরও পুরোনো সময়ের মিসরকে। এমনকি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নকশাতেও ফাউন্টেন পেনের মতো একটি ধারণার সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, কলমের বিবর্তন কোনো এক ব্যক্তির একক আবিষ্কারের গল্প নয়। বরং বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন মানুষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে আধুনিক কলম তৈরি হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ওয়াটারম্যান, পার্কার এবং পরে বিরোসহ বিভিন্ন কোম্পানি কলমকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করে। বলপয়েন্ট কলমের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫০ বিলিয়ন বিক কলম তৈরি হয়েছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলম যখন হয়ে ওঠে মর্যাদার প্রতীক
কলম শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল না; একসময় এটি সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতীকেও পরিণত হয়।
একটি বিশেষ ধরনের কলম একজন মানুষের রুচি, পেশা কিংবা অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে কলম ও কালির ব্যবহার নিয়েও নানা কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। ররশাকের পরীক্ষার কথা যেমন আসে, তেমনি বিখ্যাত ব্যক্তিদের কলম নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা গল্প।
সাহিত্য ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও কলম বিশেষ জায়গা দখল করেছে। জেমস বন্ডের হাতে দেখা গেছে বিস্ফোরক কলম। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে একটি বড় লাল কলমের গল্পও প্রচলিত রয়েছে।
অন্যদিকে বিখ্যাত লেখকদের অনেকেই কলম নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ফাউন্টেন পেনকে অপছন্দ করতেন। জেন অস্টিনও নিজের খারাপ কলম নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি রাজা তৃতীয় চার্লসও নিজের কলম নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।
ডিজিটাল যুগে হারিয়ে যাচ্ছে কলম?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন অন্য জায়গায়। যে কলম একসময় মানুষের সভ্যতার অপরিহার্য হাতিয়ার ছিল, ডিজিটাল যুগে সেটিই কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে?
কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হাতে লেখার প্রয়োজন অনেক কমেছে। ই-মেইল, ডিজিটাল নোট, অনলাইন নথি ও কণ্ঠনির্ভর লেখার কারণে কলমের ব্যবহার আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে।
একসময় ‘লেখা’ মানেই ছিল কলম দিয়ে কাগজে শব্দ বসানো। এখন সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এমনকি ইংরেজি to pen শব্দটির প্রচলনও ভবিষ্যতে হয়তো scribe বা manuscript-এর মতো পুরোনো সাহিত্যিক ব্যবহারে পরিণত হতে পারে।
তবে কলমের গুরুত্ব শুধু তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও ইতিহাসকে কাগজে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার সঙ্গে এর সম্পর্ক বহু হাজার বছরের। একটি কলম দিয়ে লেখা একটি চিঠি, স্বাক্ষর, নোট কিংবা পাণ্ডুলিপির সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির যে সম্পর্ক তৈরি হয়, ডিজিটাল নথি সবসময় তা তৈরি করতে পারে না।
কলম তাই শুধু একটি লেখার যন্ত্র নয়। এটি মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রতীক, ক্ষমতার একটি হাতিয়ার এবং ইতিহাস নির্মাণের একটি মাধ্যম।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কলম হয়তো আগের মতো অপরিহার্য নয়। কিন্তু মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে তার অবদান এত গভীর যে, কলমকে পুরোপুরি বিদায় জানানো মানে মানুষের নিজের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে বিদায় জানানো।












