ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে। কিন্তু যে লক্ষ্য সামনে রেখে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে অর্জিত হয়নি। বরং যুদ্ধের পরিধি সামরিক অভিযান ছাড়িয়ে অর্থনীতি ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা সেই জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই সংঘাতের গতিপথ একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানকে নিয়ে একটি সুসংহত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করতে পেরেছে, নাকি একের পর এক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধ নিজেই নতুন সংকট তৈরি করছে?
দ্রুত যুদ্ধের হিসাব কেন বদলে গেল

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত হানা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সংঘাতকে কয়েক সপ্তাহের একটি সীমিত অভিযান হিসেবে দেখিয়েছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হবে, পারমাণবিক কর্মসূচি থামবে এবং দেশটির সরকার বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হবে অথবা ক্ষমতা হারাবে।
কিন্তু যুদ্ধ সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। প্রথম দিকে ব্যাপক বিমান হামলা হলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং দেশটি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে সামনে নিয়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত চালিয়ে যায়।
প্রায় ৪০ দিনের মধ্যে বড় সামরিক অভিযান অনেকটাই কমে এলেও সংঘাত শেষ হয়নি। সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার উদ্যোগও স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠল নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান সেখানে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং জাহাজগুলোর জন্য অনুমতি ও ফি দাবি করে। ফলে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি বড় কৌশলগত সমস্যা। কারণ ইরানের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত করা এক বিষয়, আর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে স্থিতিশীল রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

যুদ্ধের আর্থিক মূল্যও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন সেনা নিহত এবং শত শত আহত হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয় ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে দেশটিতে তেল ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। ফলে দ্রুত বিজয়ের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ক্রমেই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে।
নিষেধাজ্ঞা দিয়েও মিলল না সমাধান
সামরিক চাপ কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ার পর ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ নামে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। জাহাজ চলাচল, তেল, সোনা, ডিজিটাল সম্পদ, বিমান পরিবহন এবং ছায়া কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিন্তু ইরান বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার পথও দেশটি খুঁজে নিয়েছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়, কারণ এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে দুর্বল করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি।
‘ট্যাংকারের জবাবে ট্যাংকার’
এরপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশল নেয়। ইরানের তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এক দফায় পাঁচটি ট্যাংকারও হামলার শিকার হয়। এর জবাবে ইরান তেলবাহী জাহাজের জন্য আরও কঠোর সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন স্বার্থে হামলার হুমকি দেয়।

ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি এর নাম পরিবর্তনের কথাও বলেছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখিয়েছে, ইরানও এই জলপথে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। হুমকি, হামলা ও চলাচলে বিধিনিষেধের মাধ্যমে তেহরান প্রণালিটিকে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন।
তিনটি সম্ভাব্য পথ
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূলত তিনটি পথ রয়েছে।
প্রথমটি হলো সীমিত সামুদ্রিক সংঘাত দীর্ঘায়িত করা। ট্যাংকারে হামলা, বিচ্ছিন্ন সামরিক অভিযান এবং নৌবাহিনীর পাহারা বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে পারে। ইরানও পাল্টা নিষেধাজ্ঞা ও হামলা বাড়াতে পারে। এতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না হলেও তেলের দাম উঁচু থাকবে এবং সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা চলবে।
দ্বিতীয় পথ হলো ব্যাপক সামরিক অভিযান। ইরানের বিদ্যুৎ, তেল স্থাপনা, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে বড় আকারের হামলা চালানো হতে পারে। ইসরায়েলও এতে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারে। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি বা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। তাতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে এবং বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় পথ হলো সংঘাতের আঞ্চলিকীকরণ। হুথি বা অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরাসরি যুক্ত হতে পারে। উপসাগরীয় কোনো দেশের স্থাপনায় হামলা হলে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতও প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সময়ে চীন বা রাশিয়া ইরানকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সমর্থন করতে পারে। সংঘাত লোহিত সাগর বা বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
যুদ্ধের বদলে দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধ?

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা এখন হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ। সীমিত সামরিক সংঘর্ষ, আংশিক অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞার সমন্বয়ে দুই পক্ষই একে অপরকে ধীরে ধীরে চাপে রাখবে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও এর মূল্য দেবে—বিশেষ করে জ্বালানির দাম, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সামরিক ও কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে।
এখানেই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের সক্ষমতায় বড় ধরনের ক্ষতি করতে পেরেছে। কিন্তু সেই ক্ষতিকে এখনো রাজনৈতিক আত্মসমর্পণে রূপান্তর করতে পারেনি।
অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করার মতো অবস্থানে নেই। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষমতাও তার সীমিত। কিন্তু প্রণালিটিকে এমন ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পেরেছে যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এখনো সংঘাতের কেন্দ্রীয় উপাদান।
ফলে যুদ্ধটি আর কেবল ইরানের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান নয়। এটি এখন সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ লড়াই। ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—আরও বড় যুদ্ধে না গিয়ে কীভাবে এমন একটি রাজনৈতিক ফল অর্জন করা যায়, যা এত দীর্ঘ সংঘাতের পরও এখন পর্যন্ত অধরা রয়ে গেছে।












