ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) চলতি সপ্তাহেই নীতি সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে বাজার। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকা, মূল্যস্ফীতির চাপ খাদ্য ও জ্বালানির বাইরেও ছড়িয়ে পড়া এবং বিশ্বের বড় কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে কড়াকড়ি—সব মিলিয়ে আরবিআইয়ের সামনে সুদের হার বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।
বুধবার আরবিআইয়ের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসার কথা। রয়টার্সের সাম্প্রতিক জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ জন অর্থনীতিবিদের মধ্যে ৩৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ, ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট সুদ বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন। তবে বাজারের প্রত্যাশা আরও জোরালো। সুদের হারভিত্তিক অদলবদল বাজারে ইতোমধ্যেই সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় পুরোপুরি হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়েছে।
সুদ বাড়ানো হলে এটি হবে প্রায় চার বছরের মধ্যে আরবিআইয়ের প্রথম নীতি সুদ বৃদ্ধি। বর্তমানে দেশটির মূল নীতি সুদ বা রেপো রেট ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রায় ১০ মাস ধরে এই হার অপরিবর্তিত রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে আরবিআই মোট ১২৫ ভিত্তি পয়েন্ট সুদ কমিয়েছিল। তখন রেপো রেট ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে আনা হয়। এবার মূল্যস্ফীতির নতুন চাপের কারণে সেই নীতির বিপরীত পথে হাঁটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক অব আমেরিকার ভারত ও আসিয়ান অঞ্চলের অর্থনীতিবিদ রাহুল বাজোরিয়ার মতে, প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতির চাপ বিস্তৃত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমে এসেছে। ফলে আরবিআইয়ের সামনে এখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার যুক্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি মনে করছেন, অক্টোবরে শুরু হতে পারে মোট ১০০ ভিত্তি পয়েন্ট পর্যন্ত সুদ বাড়ানোর একটি চক্র। তার ভাষায়, বিষয়টি শুধু গত ডিসেম্বরে করা একটি সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি স্থায়ীভাবে গেঁথে যাওয়ার আগেই অর্থনীতিতে অতিরিক্ত সহজ অর্থের প্রবাহ কমিয়ে আনার বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ বছরের শুরুতে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মতো বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও আরবিআই কিছুটা অপেক্ষা করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। খাদ্য ও জ্বালানির পাশাপাশি ভোক্তা মূল্যসূচকের অন্যান্য অংশেও দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আগস্টে ভারতের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি আরবিআইয়ের ৪ শতাংশের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে এবং টানা তৃতীয় মাসে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে। ভোক্তা মূল্যসূচকের প্রায় অর্ধেক পণ্যের ঝুড়িতে মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার সমান বা তার ওপরে রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছাড়াই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরবিআইয়ের হাতে সুদ বাড়ানোর কিছুটা সুযোগ রয়েছে।
সুদ না বাড়ালে চাপ বাড়তে পারে
বাজারের একটি বড় অংশ এখন আরবিআইয়ের কাছ থেকে সুদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আশা করছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এবারও সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে, তাহলে ভারতীয় মুদ্রা ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জেবি ড্রাক্স হনোরের এশিয়া ম্যাক্রো কৌশলবিদ বিবেক রাজপাল মনে করেন, সুদ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত ভারতীয় মুদ্রাবাজার ভালোভাবে নাও নিতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডেও চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও সুদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে—এমন বার্তাও আরবিআইকে দিতে হতে পারে।
ভারতের রুপিও বেশ কিছুদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। মে মাসে রেকর্ড নিম্নস্তরে যাওয়ার পরও মুদ্রাটি সেই অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১ শতাংশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার সময় প্রকৃত বা মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকায় ভারতের জন্য নীতিতে কিছুটা কঠোরতা আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ টানতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
সুদের হার বাড়ালে ভারতীয় সরকারি বন্ড বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এতে বিদেশি অর্থপ্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং রুপির ওপরও কিছুটা সহায়তা আসতে পারে।
কতটা বাড়তে পারে সুদ?
তবে আরবিআই একবারে কতটা সুদ বাড়াবে এবং এরপর কতদূর যাবে—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নোমুরা ও বার্কলেসের অর্থনীতিবিদেরা ২৫ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্টের তুলনামূলক ছোট একটি সুদ বাড়ানোর চক্রের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। অন্যদিকে ব্যাংক অব আমেরিকা ও এএনজির বিশ্লেষকেরা ৭৫ থেকে ১০০ ভিত্তি পয়েন্ট পর্যন্ত সুদ বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন।
অদলবদল বাজারের হিসাব আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেখানে আগামী ১২ মাসে প্রায় ১০০ ভিত্তি পয়েন্ট এবং আগামী ২৪ মাসে প্রায় ১৪০ ভিত্তি পয়েন্ট পর্যন্ত সুদ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে অক্টোবরে আরবিআই দীর্ঘমেয়াদি সুদ বাড়ানোর চক্রের বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নাও দিতে পারে। ডিসেম্বরের বৈঠকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আরও কঠোর অবস্থানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ কারণে এবারের বৈঠকে শুধু সুদের হার বাড়ানো হলো কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে আরবিআই কী পরিবর্তন আনে এবং দীর্ঘদিনের ‘নিরপেক্ষ’ নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসে কি না—সেদিকেও নজর থাকবে বাজারের।
শেষ পর্যন্ত আরবিআইয়ের সিদ্ধান্ত ভারতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রুপি, বন্ডবাজার, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আগামী কয়েক মাসের সুদের হারের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।












