বিশ্ববাজারে সোনার দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় এশিয়ার কয়েকটি স্বর্ণ উৎপাদক দেশ নিজেদের খনি থেকে পাওয়া সোনার বড় অংশ দেশের ভেতরেই ধরে রাখার দিকে ঝুঁকছে। কোথাও স্থানীয়ভাবে সোনা পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, আবার কোথাও রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে কর আরোপ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সোনা কেনার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সোনার সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সুফল দেশের অর্থনীতিতে বেশি করে ধরে রাখাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন ডলারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থার কিছুটা দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ।
ফলে এশিয়ার স্বর্ণ উৎপাদক দেশগুলোর নীতিতে ধীরে ধীরে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে অর্থনীতিবিদেরা ‘সম্পদ জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে উৎপন্ন মূল্য দেশের ভেতরে ধরে রাখার চেষ্টা বাড়ছে।
সোনার দাম বাড়ার ফলে খনি থেকে উত্তোলিত সোনার অর্থনৈতিক মূল্যও বেড়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে উৎপাদক দেশগুলো কাঁচা বা অপরিশোধিত সোনা বিদেশে পাঠিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তা পরিশোধন ও বাণিজ্য হয়। কিন্তু এখন কিছু দেশ চাইছে, উৎপাদনের পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বাণিজ্যের বড় অংশই যেন নিজস্ব অর্থনীতির মধ্যে থাকে।
এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা। ডলারের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। সোনা কোনো একটি দেশের মুদ্রা বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এটিকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এশিয়ার উৎপাদক দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের খনি থেকে পাওয়া সোনা বিদেশে রপ্তানি না করে দেশে রাখলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানো যায়, অন্যদিকে জাতীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণও বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ার বিষয়টিও দেশগুলোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে কোনো দেশের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে বৈদেশিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সোনার মতো বাস্তব সম্পদকে কৌশলগত মজুত হিসেবে ধরে রাখার আগ্রহ বাড়ছে।
তবে এই নীতির অর্থ এই নয় যে এশিয়ার সব স্বর্ণ উৎপাদক দেশ একই ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কেউ পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কেউ রপ্তানিতে কর বা বিধিনিষেধ ব্যবহার করছে, আবার কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের সোনা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
সোনার দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে এই প্রবণতা আরও জোরালো হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সোনার সরবরাহব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। উৎপাদক দেশগুলো যদি নিজেদের উৎপাদনের বড় অংশ স্থানীয় বাজারে বা সরকারি মজুতে রেখে দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য সোনার পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, সোনার মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভের বিষয় নয়; উৎপাদক দেশগুলোর কাছেও এটি কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন হয়ে উঠছে। ডলারের ওপর আস্থা, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এশিয়ায় নিজেদের সোনা নিজেদের কাছে রাখার প্রবণতা নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।












