উপসাগরে আবার যুদ্ধের দামামা। ইয়েমেন ঘিরে সৌদি আরব আর হুতিদের পাল্টাপাল্টি হামলায় সানা ও রিয়াদ দুই শহরই কেঁপে উঠেছে। খবর অনুযায়ী, গত মাসে হুতিরা ঝটিকা অভিযানে লোহিত সাগর উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারকে সেখানে ফেরাতে এখন বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদের জরুরি বৈঠকও ডাকা হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সেনা সমাবেশের খবর আসছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে হামলার আগেও ঠিক এমন প্রস্তুতি দেখা গিয়েছিল।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ইয়েমেন যুদ্ধে বাইরের হস্তক্ষেপ কখনো শান্তি আনেনি। বরং প্রতিটি নতুন অভিযান মানবিক বিপর্যয় বাড়িয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে দেশটির লাখ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে, তাদের মধ্যে ২০ লাখের বেশি শিশু। এই অবস্থায় আরও আঞ্চলিক শক্তি যুদ্ধে জড়ালে জট শুধু আরও পাকবে। পাকিস্তানের দৈনিক ডন ৪ অক্টোবরের সম্পাদকীয়তে যুক্তি দিয়েছে, সবচেয়ে ভালো পথ হলো মুসলিম ও আরব দেশগুলোর উদ্যোগে সৌদি-হুতি যুদ্ধবিরতি ফিরিয়ে আনা। পত্রিকাটির মতে, হুতিদের সৌদি আরবে হামলা বন্ধ ও বাব আল-মান্দেবে অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর সৌদি আরবের উচিত হুতি এলাকার অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ভাবা।
ইরান প্রশ্নেও একই কথা খাটে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি এর মধ্যেই বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রণালি খোলা নিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র ফিরিয়ে দিয়েছে। আলোচনার টেবিলে না ফিরে নতুন হামলার পথে গেলে তা হবে বড় ভুল। যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ তোলে ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, ইরানেরও প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। দুই পক্ষের অনড় অবস্থান শেষ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলকেই মূল্য দিতে বাধ্য করছে। যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধরত দেশগুলো বহন করে না, বহন করে দূরের দেশের সাধারণ মানুষও।
বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধ দূরের খবর নয়। দেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে কাজ করেন লাখো বাংলাদেশি। সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় ১১ মাসে সর্বনিম্ন হয়েছে, যদিও পুরো প্রান্তিকে আয় বেড়েছে। যুদ্ধ ছড়ালে কর্মীদের নিরাপত্তা, চাকরি আর নতুন নিয়োগ, সবই ঝুঁকিতে পড়বে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি খরচ বাড়বে, চাপ পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। মোট কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশ মাত্র সাতটি দেশে যান, এই নির্ভরতাও ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সৌদি-হুতি যুদ্ধবিরতি শুধু ইয়েমেনের মানুষের জন্য নয়, বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জন্যও জরুরি।
তাই ঢাকার করণীয় এখনই ঠিক করা দরকার। উপসাগরের দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীদের তালিকা হালনাগাদ রাখা ও জরুরি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি দরকার। নতুন শ্রমবাজার খোঁজার কাজেও গতি আনতে হবে। কূটনীতিতেও বাংলাদেশের ভূমিকা আছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার মতো ফোরামে সৌদি-হুতি যুদ্ধবিরতি ও ইরান সংকটের আলোচনাভিত্তিক সমাধানের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে ঢাকা। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার দাম তত বেশি দেবে উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের মতো দেশগুলো। শান্তির পক্ষে কথা বলা তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেরও কথা।












