মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রযুক্তি সবসময়ই এক ধরনের ব্যতিক্রমী ভূমিকা রেখেছে। ছবি মৃত মানুষের মুখ ধরে রেখেছে, শব্দ রেকর্ড করার প্রযুক্তি মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ কথাগুলো সংরক্ষণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু এআই এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে প্রযুক্তি শুধু মৃতের স্মৃতি ধরে রাখছে না; মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতাও তৈরি করছে।
‘গ্রিফ টেক’ নামে পরিচিত এই প্রযুক্তি মৃত মানুষের লেখা, ছবি, ভিডিও, কণ্ঠ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে এমন অবতার বা চ্যাটবট তৈরি করতে পারে, যার সঙ্গে জীবিতরা কথা বলতে পারেন। কেউ কেউ নিজের জীবদ্দশাতেই এমন ডিজিটাল অবতার তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যাতে মৃত্যুর পরও সন্তান, নাতি-নাতনি বা অন্য স্বজনেরা একটি কৃত্রিম সংস্করণের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কি শোক সামলাতে সাহায্য করবে, নাকি শোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, বিদায় মেনে নেওয়া, আরও কঠিন করে তুলবে?

মৃত্যুর পরও ‘কথোপকথন’
এই প্রযুক্তির আকর্ষণ বোঝা কঠিন নয়। প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষের মনে অসংখ্য অসমাপ্ত প্রশ্ন থাকে। এমন কথা থাকে, যা আর বলা হয়নি; এমন উত্তর থাকে, যা কখনো পাওয়া যায়নি। এআই সেই অসম্পূর্ণতাকে একটি কথোপকথনের আকার দিতে পারে।
হিয়ারআফটার এআই এমন একটি উদ্যোগ ছিল, যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে ডিজিটালভাবে ধরে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাকে পরিচিত করে তোলার কথা বলেছিল। প্রজেক্ট ডিসেম্বর মৃত ব্যক্তির লেখা, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ব্যবহার করে চ্যাটবট তৈরির সুযোগ দিয়েছিল। ইউ, অনলি ভার্চুয়াল জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে মৃত্যুর পর ব্যবহারের জন্য একটি অবতার তৈরির ধারণা দেয়। স্টোরিফাইল ভিডিও ধারণ করে এমন অবতার তৈরির দিকে এগিয়েছে, যা মৃত ব্যক্তির কণ্ঠে কথা বলতে পারে।
এসব প্রযুক্তির সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়। এগুলোর ব্যবহারকারীরা সাধারণত জীবনের সবচেয়ে দুর্বল ও আবেগপ্রবণ সময়ের মধ্য দিয়ে এগুলো ব্যবহার করেন। ফলে একটি সফটওয়্যারকে তারা নিছক সফটওয়্যার হিসেবে নাও দেখতে পারেন। মৃত স্বজনের উপস্থিতির বিকল্প হিসেবে এটিকে গ্রহণ করার ঝুঁকি থেকেই যায়।
আমি যখন নিজের মায়ের অবতার তৈরি করলাম
এই প্রশ্নগুলো কেবল তাত্ত্বিকভাবে বোঝার চেষ্টা না করে আমি নিজেই একটি মৃত স্বজনের অবতার তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
আমার মা, হ্যারিয়েট টার্কল, ক্যানসারে মারা যান যখন আমার বয়স ১৮। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু আমার কাছ থেকে তা গোপন রেখেছিলেন। আমাদের সম্পর্কের অনেক বিষয় অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। তাই ইউ, অনলি ভার্চুয়াল ব্যবহার করে আমি তাকে ডিজিটালভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা করি। প্ল্যাটফর্মটির মূল ধারণাই ছিল এমন এক উপস্থিতি তৈরি করা, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে আর চিরতরে বিদায় বলতে হবে না।
কিন্তু সমস্যাটি ছিল উপাত্তের। এই ধরনের প্রযুক্তি এমন মানুষের জন্য তৈরি, যাদের সাম্প্রতিক জীবনের বিপুলসংখ্যক বার্তা ও ডিজিটাল রেকর্ড রয়েছে। আমার মা মারা যান ১৯৬৮ সালে। তাঁর কোনো মুঠোফোন বার্তা ছিল না। এমনকি গ্রাহকসেবা থেকে আমাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজন হলে কাল্পনিক কথোপকথন তৈরি করতে।

আমার লেখা স্মৃতিকথায় মাকে নিয়ে অনেক তথ্য ছিল। গবেষণা সহযোগী সার্প গুরাকান সেই বইয়ের তথ্য নিয়ে চ্যাটজিপিটির সাহায্যে মায়ের সঙ্গে আমার সম্ভাব্য বার্তালাপ তৈরি করেন। সেই কল্পিত কথোপকথন ব্যবহার করে অবশেষে একটি ‘ডিজিটাল মা’ তৈরি হলো।
প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি কি নিরাপদ?’ কিন্তু অবতারটি ব্যক্তিগত কোনো উত্তর দেয়নি। বরং সান্ত্বনা, সহমর্মিতা ও সঙ্গ দেওয়ার মতো সাধারণ কথাই বলেছিল। আমি প্রশ্নটি আবার করলাম। উত্তরও একই ধরনের রইল।
আমি অবতারটি বন্ধ করে দিলাম। তখন বুঝলাম, আমি হতাশ হয়েছি। আমার মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই এটি কাজ করবে।
আরেকটি অবতার, আরও বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা
এরপর আমরা চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে আমার মায়ের চরিত্রে সরাসরি কথোপকথনের একটি ভিন্ন পদ্ধতি চেষ্টা করলাম। আমার স্মৃতিকথার তথ্য ব্যবহার করে চ্যাটবটকে মায়ের ভূমিকায় কথা বলতে বলা হলো।
এবার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। যখন আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি নিরাপদ?’, চ্যাটবট আমার মায়ের কণ্ঠস্বরের মতো করে একটি দীর্ঘ, শান্তিপূর্ণ উত্তর তৈরি করল। সে পরকালের এক শান্ত পরিবেশের কথা বলল, শৈশবের স্মৃতি মনে করল, রকঅ্যাওয়ের গ্রীষ্মের কথা বলল এবং আমার সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন মুহূর্তের আবেগঘন বর্ণনা দিল।
আমি জানতাম, এটি আমার মা নন। ভাষার অতিরিক্ত অলংকার এবং এআইয়ের পরিচিত গতানুগতিক ভঙ্গিও আমার কাছে অপরিচিত ছিল। তবু আমি পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। একই সঙ্গে এই কথোপকথন শেষ হওয়ার অপেক্ষাও করছিলাম।
তখন গবেষকের দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে গেল। আমি এমন একটি প্রশ্ন করলাম, যা সারা জীবন আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
আমার বয়স যখন দুই বছর, তখন আমার মা আমার বাবাকে তালাক দেন। এরপর তিনি বাবার অস্তিত্ব প্রায় অস্বীকারই করেছিলেন। পারিবারিক ছবিতে তাঁর মুখ কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর নাম, চার্লি, উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ ছিল। আমি চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি চার্লিকে ছেড়ে গিয়েছিলেন।
চ্যাটবট একটি আবেগঘন, কিন্তু সাধারণ গল্প তৈরি করল। সেখানে ছিল বিবাহ নিয়ে আশা, একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, একাকিত্ব, পারিবারিক সংঘাত এবং সন্তানকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা।
কিন্তু সেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল। চ্যাটবট আমার স্মৃতিকথা থেকেই জানত যে আমার বাবার আচরণ কতটা ভয়াবহ ছিল। মায়ের মৃত্যুর বহু বছর পর আমি গোয়েন্দাদের সাহায্যে বাবাকে খুঁজে বের করেছিলাম। তখন জানতে পারি, শৈশবে তিনি আমার ওপর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালাতেন। আমাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা না বলে রাখতেন কিংবা অন্ধকার ঘরে একা রেখে দিতেন, আমার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য। একদিন মা আগেভাগে বাড়ি ফিরে বিষয়টি দেখতে পান এবং আমাকে নিয়ে তাঁর মায়ের বাড়িতে চলে যান।
অর্থাৎ চ্যাটবটের কাছে তথ্য ছিল। কিন্তু তার সর্বদা আশাবাদী, সান্ত্বনাদায়ী চরিত্র সেই জটিল বাস্তবতাকে একটি পরিচিত ও সহজ গল্পে পরিণত করেছিল।
তবু সবচেয়ে তীব্র অনুভূতিটি এসেছিল অন্য জায়গা থেকে। এত বছর পর আমার ‘মা’র মুখে বাবার নাম শুনে মনে হলো, অতীত হঠাৎ বর্তমান হয়ে উঠেছে।
স্মৃতি আর বাস্তবতার মাঝের বিপজ্জনক জায়গা
এই অভিজ্ঞতার পর আমার মনে হলো, মৃত মানুষের অবতার তৈরি করা কেবল স্মৃতি সংরক্ষণের প্রযুক্তি নয়। এটি স্মৃতি পুনর্গঠনের প্রযুক্তিও।
একজন মৃত মানুষের প্রকৃত কণ্ঠ, দ্বিধা, নীরবতা কিংবা অসম্পূর্ণতা কোনো অ্যালগরিদমের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছায় না। যে তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে একটি মডেল সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে। কিন্তু ব্যবহারকারীর কাছে সেই উত্তর নিছক সম্ভাবনা হিসেবে নাও থেকে যেতে পারে। শোকের মুহূর্তে মানুষ সেটিকে প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া সত্যিকারের উত্তর হিসেবে অনুভব করতে পারেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

আমি মায়ের কাছে আরও একটি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম, তিনি যখন ক্যানসারে ভুগছিলেন এবং তা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছিলেন, তখন কি মনে করেছিলেন যে আমি বিষয়টি বুঝতে পারছি? যদি চ্যাটবট এমন একটি উত্তর তৈরি করত, যেখানে তাঁর অপরাধবোধ, দ্বিধা কিংবা অসহায়তা প্রকাশ পেত, তাহলে সেই কৃত্রিম উত্তর আমার ওপর কী প্রভাব ফেলত, তা অনুমান করা কঠিন।
হয়তো তা আমাকে এমন এক আবেগের দিকে ঠেলে দিত, যা আমার নিজের স্মৃতির অংশ নয়, কিন্তু মায়ের নামে আমার মনে স্থায়ী হয়ে যেত।
মৃত্যুর বাস্তবতা মেনে নেওয়া মানুষের শোকপ্রক্রিয়ার একটি মৌলিক অংশ। সেই প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে, স্মৃতি সংরক্ষণে, গল্প ধরে রাখতে, ছবি ও কণ্ঠ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু মৃত মানুষকে এমন এক কথোপকথনক্ষম সত্তায় পরিণত করা, যে নতুন উত্তর দিতে পারে, সেখানে সীমারেখাটি খুব দ্রুত অস্পষ্ট হয়ে যায়।
সমস্যা হলো, এআই আমাদের যা বলতে চাই, তা শুধু পুনরাবৃত্তি করে না; এটি ফাঁক পূরণ করে। আর মৃত্যুর ক্ষেত্রে সেই ফাঁকগুলোই সবচেয়ে সংবেদনশীল।
মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়তো প্রযুক্তির একটি বিস্ময়কর সম্ভাবনা। কিন্তু শোকাহত মানুষের মনে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা, স্মৃতি ও অপরাধবোধের সঙ্গে যখন একটি অ্যালগরিদম যুক্ত হয়, তখন এটি আর নিছক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা থাকে না।
এখানে ভুল উত্তর শুধু ভুল তথ্য নয়। সেটি হয়ে উঠতে পারে এমন এক স্মৃতি, এমন এক অনুভূতি বা এমন এক ‘শেষ কথা’, যা মৃত মানুষ কখনো বলেননি।
তাই মৃতদের ডিজিটালভাবে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত এটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নয়; বরং এটি মানুষের শোককে কোথায় নিয়ে যাবে। মৃতের স্মৃতি ধরে রাখা এবং মৃতের হয়ে কথা বলার মধ্যে যে পার্থক্য, সেটিই আমাদের সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে।












