১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে চীনের স্থানীয় সরকারগুলোর অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল জমি। জমি বিক্রি হয়েছে, সেই অর্থে অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, আবাসন প্রকল্প বেড়েছে এবং নির্মাণ ও বিনিয়োগের দ্রুত চক্র অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আবাসন সংকট ও স্থানীয় ঋণের বিস্ফোরণ এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখন বেইজিং যে পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, তা শুধু আবাসন খাতের সংস্কার নয়; এটি স্থানীয় সরকারগুলোর অর্থনৈতিক প্রণোদনাই বদলে দিতে পারে।
আগস্টে ঘোষিত কয়েকটি পদক্ষেপ সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত। কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভূমিনির্ভর অর্থায়ন থেকে সরে স্থানীয় সরকারকে ভোগ, বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন সফল হলে চীনের প্রবৃদ্ধির কাঠামো যেমন বদলাতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়বে।
ভূমি বিক্রির মডেল কেন ভেঙে পড়ল
দীর্ঘ সময় ধরে চীনের স্থানীয় সরকারের জন্য জমি ছিল সহজলভ্য রাজস্বের উৎস। শহরের প্রান্তে গ্রামীণ জমি অধিগ্রহণ করে উন্নয়নকারীদের কাছে উন্নয়নের অধিকার বিক্রি করা হতো। নির্মাতারা আবার আবাসন নির্মাণ শেষ হওয়ার বহু আগেই ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন। সেই অর্থ ব্যবহার করে চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন প্রকল্পও শুরু করা সম্ভব হতো।

এই ব্যবস্থা একসময় অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কোটি কোটি মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসে আধুনিক আবাসনে বসবাসের সুযোগ পেয়েছে। স্থানীয় সরকার বিপুল অর্থ পেয়েছে, যা দিয়ে সড়ক, মেট্রো, উঁচু ভবন ও শিল্পপার্ক নির্মিত হয়েছে। একই অবকাঠামো চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি শক্তি বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি মডেলের ভিত্তি ছিল বিপুল ঋণ ও ক্রমাগত সম্পত্তি বিক্রির ওপর। কোভিড মহামারির সময় সেই কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসে। ২০২১ সালের পর থেকে আবাসনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক নির্মাণ কোম্পানি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে, কেউ কেউ দেউলিয়াও হয়েছে। স্থানীয় সরকারগুলোর জমি বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্বও একই সঙ্গে কমেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে সাংহাইয়ের অবস্থাই যথেষ্ট। চীনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহরগুলোর একটি সাংহাই চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে মহামারি ছাড়া প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতা। পরিবারগুলো তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আবাসনের মূল্য কমতে দেখে ব্যয় কমিয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হওয়ায় বেইজিংকে এমন একটি ক্ষেত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হয়েছে, যা এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, রপ্তানি।
কিন্তু এই কৌশলেরও মূল্য আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের প্রবাহ বাড়লে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের সম্ভাবনাও বাড়ে। একই সময়ে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। বৃহত্তর কর্মশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ এখন এমন ‘নমনীয় কর্মসংস্থানে’ যুক্ত, যেখানে নিশ্চিত মজুরি বা চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা নেই, এমন একটি বহুল উদ্ধৃত হিসাবও রয়েছে।
ভোগ বাড়াতে হলে স্থানীয় অর্থনীতির প্রণোদনা বদলাতে হবে
চীন বহু বছর ধরেই অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ ভোগের দিকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারের রাজস্বব্যবস্থা সেই লক্ষ্যকে উৎসাহিত করেনি। দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ ছিল জমি বিক্রি, নির্মাণ ও বিনিয়োগ। স্থানীয় মানুষ কতটা ব্যয় করছে বা স্থানীয় ব্যবসা কতটা সক্রিয়, তার ওপর সরকারি আয় সরাসরি নির্ভর করত না।
এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সম্পত্তি কর বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ২০১০-এর দশকের শুরু থেকে কয়েকটি শহরে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী আইন প্রণয়নের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে মধ্যবিত্তের ওপর নতুন করের চাপ তৈরি করার রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিকল্পনাটি বারবার পিছিয়ে গেছে।
এর পরিবর্তে বেইজিং বারবার প্রণোদনার পথ বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি আটটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান নতুন মূলধন ঢালা হয়েছে। এর আগের বছরও ৫০০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব পদক্ষেপ আর্থিক চাপ কমাতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না।
এ কারণেই আগস্টের সংস্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

আবাসন খাতে ঋণের লাগাম
প্রথম পরিবর্তনটি আবাসন খাতের অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার ওপর আঘাত করছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার বহু আগে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রি-সেল ব্যবস্থা চীনের আবাসন বিস্তারের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি ছিল। কিন্তু একই ব্যবস্থা অনেক ক্রেতাকে এমন ফ্ল্যাটের মালিকানার চুক্তিতে আটকে দিয়েছে, যার নির্মাণ শেষ হয়নি।
নতুন নিয়মে এই ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ভবনের মূল কাঠামো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রি-সেল অনুমতি পাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।
এর ফলে আবাসন খাতের দ্রুত অর্থ ঘোরানোর পুরোনো পদ্ধতি আর সহজে ফিরে আসবে না। এটি স্বল্পমেয়াদে নির্মাণের গতি কমাতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে অতিরিক্ত ঋণ ও অসম্পূর্ণ আবাসন প্রকল্পের ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যও পূরণ করবে।
স্থানীয় সরকারের করক্ষমতায় বড় পরিবর্তন
দ্বিতীয় পরিবর্তনটি আরও গভীর। এটি কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কর আদায়ের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর উদ্যোগ। ১৯৯৪ সালের কর-বণ্টন সংস্কারের পর প্রথমবারের মতো বেইজিং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকৃত কর রাজস্বের ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে এগোচ্ছে।
চীনের ভোগ কর এতদিন কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনেই ছিল। আগস্টের শেষ দিকে স্টেট কাউন্সিল জাতীয় আইনসভাকে জানায়, এই রাজস্বের একটি অংশ স্থানীয় সরকারকে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদনের জায়গার বদলে পণ্য বিক্রির স্থানে কর আদায়ের ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি তখন শুধু সেখানে কত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে না; মানুষ সেই শহরে কতটা ব্যয় করছে, তার সঙ্গেও রাজস্বের সম্পর্ক তৈরি হবে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের আচরণও এতে বদলাতে পারে। পুরোনো ব্যবস্থায় বেশি জমি বিক্রি, বেশি নির্মাণ ও নতুন বিনিয়োগ ছিল রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর পথ। নতুন ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারকে দোকান, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগী হওয়ার অর্থনৈতিক কারণ তৈরি হবে।

অসম্পূর্ণ সংস্কার, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মোড়
অবশ্য এসব পদক্ষেপ চীনের সব অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করবে না। দেশটির কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হচ্ছে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং স্থানীয় সরকার ও তাদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের বোঝা এখনো বিশাল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জমি বিক্রি থেকে যে বিপুল রাজস্ব আসত, নতুন করব্যবস্থা তা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
এই বাস্তবতায় আবাসিক সম্পত্তির ওপর কর আরোপের প্রশ্ন ভবিষ্যতে আবার সামনে আসতে পারে। বেইজিং অতীতে যে পরিকল্পনা একাধিকবার স্থগিত করেছে, সেটি স্থায়ীভাবে বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও কারণ নেই।
তবু আগস্টের পরিবর্তনের গুরুত্ব খাটো করার সুযোগ নেই। চীন স্থানীয় সরকারগুলোকে সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তাটি দিয়েছে যে জমি, ঋণ ও অতিরিক্ত নির্মাণনির্ভর পুরোনো অর্থনৈতিক মডেল আর ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে পারে না। তার বদলে ভোগ ও স্থানীয় বাণিজ্যকে রাজস্বের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
এর প্রভাব চীনের সীমানার বাইরেও পড়তে পারে। জমির রাজস্ব দিয়ে শিল্প ও নির্মাণকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করার সুযোগ কমলে অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপও কমতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার যদি মানুষের ব্যয় ও স্থানীয় ব্যবসার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভোক্তা চাহিদা বাড়ানোর জন্য তাদের আরও সক্রিয় হওয়ার প্রণোদনা থাকবে।
এতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনার সব কারণ দূর হবে না। কিন্তু চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভরতার একটি কাঠামোগত উৎস দুর্বল হতে পারে।
চীনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের আসল পরীক্ষা তাই শুধু বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় নীতিতে নয়, বরং দেশের শহরগুলো কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং স্থানীয় সরকার কোন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে তার ওপর নির্ভর করবে।
পুরোনো ভূমি-নির্ভর অর্থনীতির জায়গায় যদি মানুষের আয়, ভোগ ও স্থানীয় ব্যবসা সত্যিই নতুন রাজস্বভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে এটি কেবল স্থানীয় সরকারের হিসাব বদলাবে না, চীনের প্রবৃদ্ধির চরিত্রও বদলে দিতে পারে।












