রাশিয়ার ওপর তেল রপ্তানির নির্ভরতা কমাতে নতুন পথ খুঁজছে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তান। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় তেল অবকাঠামো ও ট্যাংকারে বারবার বিঘ্ন ঘটার পর দেশটির বড় তেল উৎপাদকরা রাশিয়াকে পাশ কাটিয়ে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইউরোপে তেল পাঠানোর বিকল্প নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছেন।
কাজাখস্তানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম বা সিপিসির মাধ্যমে যায়। এই পাইপলাইন কাজাখস্তান থেকে রাশিয়ার ভূখণ্ড পেরিয়ে কৃষ্ণসাগরের নোভোরোসিস্ক বন্দরের কাছে টার্মিনালে পৌঁছেছে। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে তেল যায় ইউরোপের বাজারে।

সমস্যা হলো, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় চলতি বছর কয়েক দফা সিপিসির টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। এর ফলে কাজাখস্তানকে উৎপাদন কমাতেও হয়েছে। দেশটির অর্থনীতির জন্য তেল রপ্তানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি এই ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নতুন যে বিকল্প পথটি বিবেচনা করা হচ্ছে, সেটি কাজাখস্তানের তেলকেন্দ্র আতিরাউ থেকে আকতাউ বন্দরে যাবে। এরপর কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে তেল পৌঁছাবে আজারবাইজানের বাকুতে। সেখান থেকে জর্জিয়ার তিবিলিসি হয়ে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহানে পৌঁছানোর বিদ্যমান পথ ব্যবহার করা হবে।
কাস্পিয়ান সাগর পেরোনোর ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একটি হলো সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ। অন্যটি হলো বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত ট্যাংকার যুক্ত করে সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো।
প্রস্তাবিত দুটি ব্যবস্থার যেকোনো একটির সক্ষমতা বছরে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন হতে পারে। এই পরিমাণ কাজাখস্তান বর্তমানে সিপিসির মাধ্যমে যে পরিমাণ তেল পাঠায় তার অর্ধেকেরও বেশি। আবার কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে দেশটির বর্তমান রপ্তানির তুলনায় এটি প্রায় ৩০ গুণ বেশি।
তবে এই বিকল্প পথের ব্যয় অনেক বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাজাখ তেল খাতের বিশ্লেষকরা। এনার্জি মনিটর ফান্ডের নির্বাহী পরিচালক নুরলান ঝুমাগুলোভের মতে, নতুন পথ তৈরি করা ব্যয়বহুল হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

কাজাখস্তানের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র তেংগিজ ও কাশাগানের আটটি অংশীদার কোম্পানি যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তেংগিজে শেভরন ও এক্সনমোবিলের বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে। কাশাগানের প্রধান অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তানের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি কাজমুনাইগ্যাস, এনির পাশাপাশি এক্সনমোবিল, শেল ও টোটালএনার্জিজ।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফল নভেম্বর মাসে অংশীদারদের কাছে উপস্থাপন করার কথা। এরপর তারা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে কাস্পিয়ান সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
কাজাখস্তানের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তেংগিজ তেলক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার কারণে। শেভরন সম্প্রতি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ করেছে। কোম্পানিটির দাবি, এর ফলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং তেংগিজের উৎপাদন সক্ষমতা দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল সমতুল্য পর্যায়ে উঠেছে।
কিন্তু এই অতিরিক্ত তেলের প্রায় পুরোটাই সিপিসির মাধ্যমে রপ্তানি করতে হয়। অন্য কোনো বিদ্যমান রুট এত বড় পরিমাণ তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখে না।
চলতি বছরের জুলাইয়ে তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার পর সিপিসির টার্মিনালে পণ্য ওঠানো বন্ধ হয়ে যায়। জানুয়ারি ও জুনের বিঘ্নসহ এসব ঘটনার কারণে চলতি বছরে কাজাখস্তানের মোট তেল উৎপাদন প্রায় ৩৫ লাখ টন কমেছে বলে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে ৯ কোটি ৬০ লাখ টনে নামানো হয়েছে, যা ২০২৫ সালের রেকর্ড ৯ কোটি ৯৬ লাখ টনের চেয়ে কম।
পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিয়েভের সঙ্গে হামলার বিষয়টি তোলা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতার পর সিপিসি টার্মিনালের কার্যক্রম আবার বাড়ে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে টার্মিনালটির দৈনিক লোডিং ২২ শতাংশ বেড়ে ১৪ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থও জানান, বিঘ্নের মাত্রা কমেছে।
তবে যুদ্ধের আশপাশের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গবেষক তাতিয়ানা মিত্রোভা মনে করেন, সিপিসি টার্মিনাল সরাসরি আক্রান্ত না হলেও আশপাশের সংঘাতের কারণে জাহাজ মালিকরা সেখানে যেতে দেরি করতে পারেন। নিরাপত্তার কারণে তেল তোলার কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে। ফলে অবকাঠামো অক্ষত থাকলেও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও কাজাখস্তানের তেলের গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫ কোটি ২৪ লাখ টন কাজাখ তেল আমদানি করে। চলতি মাসে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ওরলেনও সৌদি আরবের তেল সরবরাহে ড্রোন হামলার কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণে কাজাখ তেলের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।

কাজাখস্তানের বাজেট আয়ের প্রায় অর্ধেক এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ তেল ও গ্যাস খাত থেকে আসে। ফলে সিপিসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটির অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। দেশটির জ্বালানি খাতের পরামর্শক আবজাল নারিমবেতভ সিপিসিকে কাজাখ অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সিপিসি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত অন্য পথে তেল সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও খুব সীমিত। রেল ও বন্দর ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে যে পরিমাণ তেল সরানো সম্ভব, তা মাসে প্রায় ১ লাখ টন। এই পরিমাণ তেংগিজ তেলক্ষেত্রের এক দিনেরও কম উৎপাদনের সমান।
বর্তমানে তেংগিজ ও কাশাগান থেকে আকতাউ বন্দরে তেল রেলপথে পাঠানো হয়। কারণ এসব তেলক্ষেত্রের সঙ্গে আকতাউয়ের সরাসরি পাইপলাইন সংযোগ নেই। একটি রেল ট্যাংকারে প্রায় ৬০ টন তেল বহন করা যায়, যেখানে সিপিসির মাধ্যমে বছরে ৬ কোটি টনের বেশি তেল পরিবহন করা হয়। ফলে শুধু রেলপথের ওপর নির্ভর করে বিপুল পরিমাণ তেল সরানো বাস্তবসম্মত নয়।
রাশিয়াকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প পথ তৈরির উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২২ সালে একটি রুশ আদালত সিপিসির কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেওয়ার পর কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ বাকু-তিবিলিসি-জেইহান বা বিটিসি পথ দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে আদালতের সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়।
চার বছর পরও আজারবাইজান হয়ে বিটিসি পাইপলাইনে কাজাখস্তানের তেল রপ্তানির পরিমাণ বছরে মাত্র প্রায় ১২ লাখ টন। অর্থাৎ সিপিসির মাধ্যমে পাঠানো তেলের তুলনায় তা ২ শতাংশেরও কম।
নতুন কাস্পিয়ান রুটের সম্ভাব্যতা যাচাই তাই কাজাখস্তানের জন্য শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের পরীক্ষা নয়; বরং দেশের তেল রপ্তানির নিরাপত্তা ও রাশিয়াকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে বিপুল বিনিয়োগ, দীর্ঘ নির্মাণসময় এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কতটা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












