পাকিস্তানের সরকার ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা আবারও শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ। তবে এর জন্য সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’র নিশ্চয়তা দিতে হবে পিটিআইকে।
সোমবার জিও নিউজের ‘ক্যাপিটাল টক’ অনুষ্ঠানে সানাউল্লাহ বলেন, সন্ত্রাস দমনে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতি প্রাদেশিক সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। তার ভাষ্য, সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়নের সাংবিধানিক ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের রয়েছে এবং প্রাদেশিক সরকারগুলোকে সেই নীতি অনুসরণ করতে হবে।
সরকার ও বিরোধী দল পিটিআইয়ের মধ্যে সর্বশেষ দফার আলোচনা রোববার ভোরে কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। দুই পক্ষই আলোচনার ব্যর্থতার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছে।
এর আগে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি অভিযোগ করেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সরকার ও পিটিআইয়ের আলোচনাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে পিটিআইয়ের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা দাবি করেন, আলোচনার ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল খাইবার পাখতুনখোয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার একতরফাভাবে যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করেছে, তার দায় প্রাদেশিক সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা।
সানাউল্লাহ বলেন, পিটিআইয়ের প্রতিনিধিরা প্রথমে মেনে নিয়েছিলেন যে সন্ত্রাসবিরোধী নীতি কেন্দ্রীয় সরকারই প্রণয়ন করবে। পরে তারা নীতিটি সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে করার দাবি তোলে। তার মতে, এ ধরনের দাবি সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে সঠিক নয়।
তিনি বলেন, বহিরাগত আগ্রাসন মোকাবিলায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্য ফোরামে নেওয়া হয় না। এ ধরনের নীতিতে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছাতে প্রাদেশিক সরকার বাধ্য করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সানাউল্লাহ আরও জানান, রাজনৈতিক বিষয়, পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার স্বাস্থ্য এবং তার সঙ্গে বৈঠকসংক্রান্ত বিষয়গুলো অনেকটাই মীমাংসিত হয়েছিল। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সাক্ষাতের বিষয়েও সরকার সম্মত হয়েছিল। এ বিষয়ে দলটিকে আদালতের শরণাপন্ন হতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থানের বার্তা
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানান সানাউল্লাহ। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
তার দাবি, পাকিস্তানে হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীরা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ নেয় এবং সেখান থেকেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আফগান তালেবানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও তাতে উল্লেখযোগ্য সমাধান আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও চীনও তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সানাউল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, আফগানিস্তানের কিছু জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরে ইসরায়েলিরা প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তার দাবি, আফগান তালেবান আগে যে ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেনি, এখন সেসব ব্যবহারের বিষয়ও দেখা যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি অনুষ্ঠানে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেননি।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় উত্তেজনা
খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে সাম্প্রতিক লংমার্চ নিয়েও কথা বলেন সানাউল্লাহ। তিনি দাবি করেন, লাকি মারওয়াত থেকে যাত্রা শুরুর সময় ওই কর্মসূচিতে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল।
অন্যদিকে পিটিআই নেতা আসাদ কায়সার জানিয়েছেন, তার দল যেকোনো সময় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, পিটিআই তাদের দাবিগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরেছে। এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন নীতি গ্রহণ করবে এবং পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।
কায়সার আরও বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নরের শাসন বা জরুরি অবস্থা জারি করা হলে কিংবা মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদিকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে পিটিআই প্রাদেশিক ও অন্যান্য আইনসভা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তার দাবি, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খাইবার পাখতুনখোয়ায় মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা ও অধিকার খর্ব করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রীকে তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন কায়সার।
বর্তমানে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে, তার ওপর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনাও অনেকটাই নির্ভর করছে।












