হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে নতুন করে হামলার ঢেউ মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধারকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহের প্রচেষ্টায় উপসাগরীয় দেশগুলো যখন অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার কাছাকাছি নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, ঠিক তখনই নতুন হামলায় সেই অগ্রগতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন বাড়ানোর পেছনে ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষা এবং এর আগে ইরানের রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থায় চালানো হামলার প্রভাব। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তেল পরিবহনের জন্য একটি জটিল ‘শাটল’ ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে ট্যাংকারগুলো পারস্য উপসাগরের ভেতরে তেল বোঝাই করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার পর প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করছে।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কয়েক দিন জাহাজে হামলার খবর না পাওয়ার পর পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে হরমুজের আশপাশে জাহাজে সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববারও তারা আরেকটি হামলার কথা জানিয়েছে, যদিও সেটি কখন ঘটেছে তা স্পষ্ট করেনি।
এর মধ্যে শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনী মার্কিন সমর্থিত রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ওই পথে চলাচল করলে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একটি প্রকাশ্য জাহাজ চলাচলকারী রেডিও চ্যানেলে পাঠানো বার্তায় জাহাজগুলোকে দক্ষিণ করিডর ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের কাছেই গত সপ্তাহে আক্রান্ত সাতটি জাহাজের অবস্থান ছিল বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাও বেড়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
নতুন হামলার প্রভাব তেল সরবরাহে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে বলেও ধারণা করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তবে প্রকৃত পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে সময় লাগছে। কারণ লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচল করছে।
তেল সরবরাহে ফের ধাক্কার আশঙ্কা
হরমুজে নতুন হামলা এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
নতুন করে কোনো বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও বাড়তে থাকা ঋণ ব্যয়ের চাপে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের আশপাশে রয়েছে। কারণ ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, হামলা বাড়লে তেল সরবরাহ আবার কমে যেতে পারে এবং পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইনের মতে, জাহাজে হামলার তীব্রতা বাড়ার ঘটনা তেলবাজারের বর্তমান ভারসাম্য কতটা নাজুক, সেটিই দেখাচ্ছে। আরও বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হলে এবং জ্বালানি অবকাঠামো হামলার লক্ষ্য হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ২৫ ডলারে স্থির হয়। এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পূর্বাভাস, বছরের শেষ পর্যন্ত ব্রেন্টের দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে।
আক্রান্ত জাহাজগুলোর অনেকগুলোই তেলবাহী
গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত সাতটি জাহাজের অন্তত চারটি জুনের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দুই বা তার বেশি বার যাতায়াত করেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ অপরিশোধিত তেল বা তেলজাত পণ্য পরিবহন করছিল।
কুয়েত অয়েল ট্যাংকার কোম্পানির পরিচালিত বিশাল তেলবাহী জাহাজ ‘আল ফুনতাস’ ২৮ সেপ্টেম্বর হামলার শিকার হয়। তখন সেটি কুয়েতের মিনা আল-আহমাদি বন্দর থেকে ওমান উপসাগরের বন্দরগুলোর মধ্যে পঞ্চমবারের মতো শাটল যাত্রা করছিল।
একই কোম্পানির আরেকটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ ‘কাজিমাহ থ্রি’ তিনটি শাটল যাত্রা শেষ করে ১ অক্টোবর পারস্য উপসাগরে ঢোকার পথে হামলার শিকার হয়। এ ধরনের বড় তেলবাহী জাহাজে একবারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল পরিবহন করা সম্ভব।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধের পর থেকেই হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে ইরান। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে হরমুজে বিঘ্ন তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত জ্বালানির বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও হরমুজের বিকল্প হিসেবে বাইপাস পাইপলাইন ব্যবহার করে তেল পাঠানোর চেষ্টা করেছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ১ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ তা প্রায় যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রায় ফিরে গিয়েছিল।
পুনরুদ্ধারের গতি কমছে
তবে সাম্প্রতিক হামলায় সেই পুনরুদ্ধারের গতি কমে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তেলবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি কনটেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তেল প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তার প্রাথমিক হিসাবে, সরবরাহ প্রতিদিন ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমে থাকতে পারে। তবে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর এই হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
জনস্টনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়েছে, তা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা কঠিন। এমনকি সরবরাহ বাড়ানোর এই প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তার ধারণা, নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু রপ্তানিকারক দ্রুত তেল বাজারে পাঠিয়ে থাকতে পারেন।
উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো হরমুজ দিয়ে একটি শাটল যাত্রায় প্রায় ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় করছে। জাহাজভাড়া-সংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, বিমা ব্যয় বাদ দিয়েই প্রতি ব্যারেল তেলের পরিবহন খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সৌদি আরবের বিকল্প পথও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়
১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা এবং ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের জাহাজে হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহনে বাধা তৈরি হয়েছিল। এরপর সৌদি আরব আবার হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে।
তবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এখনো পুরো সক্ষমতায় চালু হয়নি। ফলে হরমুজে আবারও বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল পাঠানো কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের হিসাবে, সৌদি আরবের মোট তেল রপ্তানি আগস্টের প্রতিদিন ২৪ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৬৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।
কিন্তু তেল রপ্তানির পরিমাণ আগের পর্যায়ে ফিরে এলেই যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তা নয়। সেপ্টেম্বরে হরমুজ দিয়ে যাওয়া অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এমন ট্যাংকারে পরিবহন করা হয়েছে, যেগুলো প্রণালি পার হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের উপকূলে অপেক্ষমাণ অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করেছে।
এই শাটল ব্যবস্থা এবং সামরিক সুরক্ষায় পরিচালিত বহর দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এইচএসবিসির জ্যেষ্ঠ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বিশ্লেষক কিম ফুস্টিয়েরের মূল্যায়ন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়লেও এর পেছনে যে বিপুল ব্যয় হচ্ছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধার এখনো অত্যন্ত নাজুক। নতুন হামলা অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি নয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।












