ভারতের মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে আইন ও সরকারি নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বাল্যবিয়ে পুরোপুরি থামছে না। দারিদ্র্য, মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে পরিবারের অন্যত্র চলে যাওয়া, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, সামাজিক সম্মান রক্ষার চাপ এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা—সব মিলিয়ে অনেক পরিবার অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়াকে ‘নিরাপদ’ পথ হিসেবে দেখছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যৌন হয়রানি, অপহরণ ও নির্যাতনের ভয় এবং দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো একটি বিয়ের বাজার।
বিড জেলার একটি গ্রামের কিশোরী কীর্তির জীবনে বিয়ের স্মৃতি বাস্তবতার চেয়ে বেশি এক দুঃস্বপ্ন। রাতের ঘুম ভেঙে যায় বিয়ের অনুষ্ঠানের শব্দে—বান্দ পার্টির হিন্দি সিনেমার গান, গলায় মালা এবং মণ্ডপের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দ্বিগুণ বয়সী এক অপরিচিত পুরুষ। যে বিয়ে সে কখনো চায়নি, সেই বিয়ের দৃশ্যই এখন তার আতঙ্কের কারণ।
কীর্তির পরিবারের গল্প মারাঠওয়াড়ার বহু পরিবারের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। এখানে বাল্যবিয়ে শুধু কোনো পুরোনো সামাজিক প্রথার ফল নয়। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক ‘সম্মান’, দারিদ্র্য এবং কাজের জন্য বছরের পর বছর অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার বাস্তবতা অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
কীর্তি বিড জেলা থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরের কথোড়া গ্রামে নানা-নানির সঙ্গে থাকে। তার নানি সুমন ও নানা অচ্যুত দুজনেই দিনমজুর। দেড় একর শুকনো জমি থাকলেও তা দিয়ে সারা বছর সংসার চালানো সম্ভব নয়। বছরের প্রায় ছয় মাস তারা আখ কাটার কাজে পশ্চিম মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় চলে যান। বাকি সময় নিজেদের জমিতে কাজের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন ধরনের শ্রমের ওপর নির্ভর করেন।
সুমনের নিজের জীবনেও বাল্যবিয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার মা ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। সেই অভিজ্ঞতা সুখের ছিল না। কিন্তু সুমনের ধারণা ছিল, তখন তাদের সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না। একই বয়সে নিজের মেয়ের বিয়েও দিয়েছিলেন তিনি।
তার ভাষায়, মেয়ের বয়ঃসন্ধি শুরু হলে তাকে আর ঘরে রাখা যায় না—এমন সামাজিক ধারণাই পরিবারগুলোকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বিয়ের পর সুমনের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সন্তান জন্ম দেওয়া। প্রথমে চার মেয়ে এবং পরে এক ছেলে সন্তানের মা হন তিনি।
সুমন ও অচ্যুতের চার মেয়েরই ১৬ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পরও তাদের জীবন স্থিতিশীল হয়নি। দাম্পত্য কলহের কারণে মেয়েরা সন্তানদের নিয়ে একে একে আবার বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে এসেছে। সুমন ও তার স্বামী এখন জামাইদের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে মেয়েদের সংসারে ফেরানোর চেষ্টা করেন।
এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়েও একই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কীর্তির মা ছায়াও কয়েক মাস ধরে বাবা-মায়ের বাড়িতে রয়েছেন। স্বামী মাঝেমধ্যে তাকে ছেড়ে চলে যান এবং তিনি আবার বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা কীর্তির চোখে বিয়েকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। স্কুলের কথা উঠলে তার চোখে আগ্রহ দেখা যায়, কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই সে কেঁদে ফেলে।
ছায়া নিজের জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য মাকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, তাকে পড়াশোনা শেষ করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু নিজের তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনিও নিশ্চিত নন। মেয়েদের পড়াশোনা করানোর ইচ্ছা থাকলেও দারিদ্র্য, অনিশ্চিত আয় এবং নিরাপত্তার ভয় তাকে পুরোনো সিদ্ধান্তের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সুমনের কাছে বিষয়টি একটি কঠিন দ্বন্দ্ব। তিনি বাল্যবিয়েকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেন। আবার মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর আতঙ্কে থাকেন।
পরিবারটি যখন কয়েক মাসের জন্য আখ কাটতে অন্য এলাকায় যায়, তখন মেয়েদের সঙ্গে নেওয়া কঠিন। আবার তাদের গ্রামে একা রেখে যাওয়াও নিরাপদ মনে হয় না—এমনটাই তার দাবি। এই নিরাপত্তাহীনতার ভয় অনেক বাবা-মাকে দ্রুত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
অচ্যুতের কাছে বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ইজ্জত’ বা পারিবারিক সম্মান। তার ধারণা, কোনো মেয়েকে অপহরণ করা হলে, যৌন হয়রানির শিকার হলে, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে কিংবা সে নিজের পছন্দে কারও সঙ্গে চলে গেলে পরিবারের সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মেয়েকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে তার দায়িত্ব স্বামীর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়াকেই তিনি নিরাপদ সমাধান মনে করেন।
কিন্তু এই চিন্তার পেছনে থাকা ভয়কে কাজে লাগাচ্ছে কারা—সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিডের শিশু অধিকারকর্মী তাত্বশীল কাম্বলের মতে, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের লক্ষ্য করে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, অপরাধীচক্র বা অন্য সুবিধাভোগীরা চাপ সৃষ্টি করে থাকে। কোথাও মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, কোথাও যৌন নির্যাতনের পর ভয় দেখানো হয়, আবার কোথাও সেই পরিস্থিতির চাপে পরিবার মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
বিডের আহের ধনোরা গ্রামের একটি ঘটনায় ১৫ বছরের এক কিশোরীকে এক যুবক বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মেয়েটি প্রতিরোধ করলে তাকে সামাজিকভাবে অপমান করার ভয় দেখানো হয়। মেয়েটির পরিবার শেষ পর্যন্ত তাকে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও ওই যুবক তাদের কাছে অর্থ দাবি করে বলে অভিযোগ।
কৈজ এলাকার আরেক ঘটনায় ১৩ বছরের এক মেয়েকে স্থানীয় এক ব্যক্তির যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। পরিবারটি আইনি সহায়তা চাইতে সাহস করলেও অভিযোগ নথিভুক্ত করা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে অধিকারকর্মীদের দাবি। তাদের বক্তব্য, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্থানীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে অনেক পরিবার ভয় পায়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কিশোর-কিশোরীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ সহজ হওয়ায় অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে অপরিচিত বা স্থানীয় যুবকের সঙ্গে যোগাযোগে জড়িয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালে বিডে প্রায় ২৬৬ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিখোঁজ হয়েছিল বলে পুলিশ রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ২১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকেই অনলাইনে পরিচিত স্থানীয় যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বাড়ি ছেড়েছিল।
তবে বাল্যবিয়ের আরেকটি বড় কারণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা।
কৈজের কাছাকাছি কাসারি গ্রামের আখশ্রমিক আশা উগাড়ে বলেন, তার নিজের বিয়েও কিশোরী বয়সে হয়েছিল। তার বাবা-মা ছিলেন ভূমিহীন শ্রমিক। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে আখ কাটার কাজে যেতে শুরু করেন তিনি।
নিজের মেয়েটি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে পুনেতে এক কারখানার কর্মীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। আশার যুক্তি, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মৌসুমি শ্রমিকের জীবন কাটানো সম্ভব ছিল না, আবার বাড়িতে একা রেখে যাওয়ার নিরাপত্তা নিয়েও ভয় ছিল।
এই ভয় এবং দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েই কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বিয়ের দালালচক্র।
বিড জেলা শিশু কল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান অশোক তাংগাড়ের মতে, কিছু পরিবার মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিয়ে দিলেও এমন ঘটনাও রয়েছে যেখানে পরিবারের সদস্যরাই মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। শিরুর এলাকায় ১৫ বছরের এক কিশোরীকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তার বাবা ও সৎমায়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মেয়েটির মা ও মামার দাবি, বিয়ের আগে অর্থ লেনদেন হয়েছিল।
তাংগাড়ের বক্তব্য, দরিদ্র পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের খুঁজে বের করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে কিছু দালাল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরপক্ষ বা পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেয় তারা। তিনি আরও দাবি করেন, কোথাও কোথাও মেয়েদের প্রায় পণ্যের মতো বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিডে কয়েক বছর আগে ১৪ বছরের শীতল নিজের বাড়িতে থেকে স্কুলে যেতে ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকে স্থানীয় এক কৃষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। বারবার সে বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে আসত। একসময় স্বামীর বাড়িতে ফিরে যেতে অস্বীকার করলে পুলিশি তদন্ত অনুযায়ী, তার বাবা তাকে আখখেতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পুলিশের কাছে বাবার বক্তব্য ছিল, মেয়ে তার কথা শুনছিল না।
এই ধরনের ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, বাল্যবিয়ের পরও মেয়েদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হয় না।
জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার পঞ্চম পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের বিড জেলায় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর হওয়ার আগেই হয়েছিল। মারাঠওয়াড়ার পারভানি জেলায় এই হার ৪৮ শতাংশ। অধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় হতে পারে।
ভারতে ২০০৬ সালের বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বা ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ে বাল্যবিয়ে হিসেবে গণ্য হয়। বাল্যবিয়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ১৮ বছরের কম বয়সী স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের বিদ্যমান ফৌজদারি ও শিশু সুরক্ষা আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধের বিধান রয়েছে।
ভারতের সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ১০ শতাংশ কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে বাল্যবিবাহমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে। মহারাষ্ট্রে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে বিপুল সংখ্যক প্রতিরোধ কর্মকর্তা নিয়োগের কথাও সরকারি তথ্যতে রয়েছে।
মহারাষ্ট্রের নারী ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী অদিতি তাটকারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যে গত কয়েক বছরে বাল্যবিয়ের হার কমেছে। তবে আগামী পাঁচ বছরে তা আরও নিচে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। শুধু পরিবার নয়, বাল্যবিয়েতে সহায়তাকারী পুরোহিত, অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাঁবু সরবরাহকারী এবং অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
মৌসুমি অভিবাসনের সঙ্গে বাল্যবিয়ের সম্পর্কও সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। যেসব এলাকায় পরিবারগুলো বছরের একটি বড় সময় কাজের জন্য অন্যত্র চলে যায়, সেখানে শিশুদের নিরাপদে রাখার জন্য অস্থায়ী শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে আইন ও সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
মারাঠওয়াড়ায় খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে গণবিয়ের আয়োজনের ঘটনাও রয়েছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এসব আয়োজন কখনো কখনো দরিদ্র পরিবারগুলোর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
তবু কিছু মেয়ে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
সুমনের মেয়ে যোগিতা নিজের এবং পরিবারের অন্য মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তিনি দশম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ করতে চান এবং আবার স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পরিবারের সবাই তার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন না। বাবা-মায়ের ধারণা, মেয়েদের শেষ পর্যন্ত স্বামীর বাড়িতেই ফিরে গিয়ে স্ত্রী ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
যোগিতা সেই ধারণা মানতে চান না। নিজের পরিবারের নারীদের ওপর সহিংসতা দেখেছেন তিনি। তার মতে, মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার একমাত্র পথগুলোর একটি হলো শিক্ষা। তবে তিনি এটাও জানেন, এই পথ সহজ নয়। মেয়েদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক লড়াই করতে হবে।
বিডের গেওরাই এলাকার ১৫ বছরের রুপালি সেই লড়াই শুরু করেছে। তাকে জোর করে ২২ বছর বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের প্রথম সপ্তাহেই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় সে উদ্ধার হয়ে বিডের একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে যায়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছে। এখন আরও পড়াশোনা করতে চায়। বর্তমানে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকলেও তার নিজের পরিবারই তার সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। স্বামীকে ছেড়ে আসার কারণে তাকে এখনও পারিবারিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তারপরও রুপালির সামনে একটি আলাদা ভবিষ্যতের স্বপ্ন আছে—যেখানে তার জীবন অন্য নারীদের মতো একই চক্রে আটকে থাকবে না।
মারাঠওয়াড়ার এই গল্পগুলো দেখায়, বাল্যবিয়ে শুধু একটি বিয়ের ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা, অভিবাসী শ্রমজীবনের অনিশ্চয়তা, সামাজিক সম্মানের চাপ, শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি এবং কখনো কখনো অপরাধীদের ভয়ভীতি। একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ‘নিরাপদ’ করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
এই চক্র ভাঙতে শুধু বিয়ে বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। মেয়েদের নিরাপদে স্কুলে রাখা, পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া, মৌসুমি অভিবাসনের সময় শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যৌন সহিংসতার অভিযোগে দ্রুত ও সংবেদনশীল ব্যবস্থা নেওয়া এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ—সবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
কারণ বাল্যবিয়ে বন্ধের লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি একটি শিশুর নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই।












