শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদের কথা উঠলে সাধারণত রাজা, স্থপতি কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিকদের নামই সামনে আসে। কিন্তু এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন পুনরাবিষ্কার, খনন, উদ্ধার এবং সংরক্ষণের পেছনে যাঁরা দিনের পর দিন কঠিন পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের অনেকের নামই ইতিহাসের পাতায় প্রায় অনুপস্থিত। বেল পার্টির সদস্যরা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই দলটির অধিকাংশ সদস্য ছিলেন গ্রামাঞ্চলের সাধারণ শ্রমিক, স্থানীয় কর্মচারী ও বিভিন্ন গ্রামের প্রধান। প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ. সি. পি. বেলের নেতৃত্বে তাঁরা প্রাচীন স্থাপনা খুঁজে বের করা, জঙ্গল পরিষ্কার করা, মাটি খনন, পাথরের নিদর্শন উদ্ধার এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কোনো এলাকায় প্রাচীন স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে—এমন তথ্যও অনেক সময় স্থানীয় গ্রামবাসী ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আসত।

তাঁদের কাজ ছিল কেবল শ্রম দেওয়া নয়। খননের সময় তাঁরা পাথরের স্তম্ভ, শিলালিপি, ভাস্কর্য, দেয়ালচিত্র, মৃৎপাত্র, মুদ্রা, রত্ন, সিলমোহর, অলংকার, অস্ত্র, সরঞ্জাম ও নানা প্রত্নবস্তু শনাক্ত ও উদ্ধার করতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ এবং শিলালিপি-সংক্রান্ত কাজেও তাঁরা সহায়তা করেছেন।
কাজের পরিবেশও ছিল অত্যন্ত কঠিন। ঘন জঙ্গল, জলাভূমি, বৃষ্টি, স্রোতস্বিনী খাল ও দুর্গম পথ পেরিয়ে তাঁদের এগোতে হতো। কোথাও পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কাটতে হয়েছে, কোথাও দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটতে হয়েছে। সিগিরিয়ার মতো স্থানে খননকাজের সময় পানি সরানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করতে হয়েছিল। কখনো দল পথ হারিয়েছে, আবার গাছের ওপরে উঠে পথের দিক নির্ণয়ের চেষ্টা করেছে। দিনে প্রায় ২০ মাইল পর্যন্ত হাঁটার ঘটনাও ছিল।
এই শ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি। জঙ্গলে রাত কাটানো, মশা-পোকামাকড়ের উপদ্রব, বন্য প্রাণীর আশঙ্কা কিংবা ফুলে ওঠা জলধারা—সবকিছুর মধ্যেই তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। কোথাও নদী বা খাল পার হওয়ার জন্য গাছ কেটে সেতুর মতো ব্যবস্থা করতে হয়েছে। অথচ তাঁদের কাছে ছিল সীমিত সরঞ্জাম—তাঁবু বা ত্রিপল, ক্যামেরা, কোদাল, মাটি কাটার যন্ত্র, রান্নার সামগ্রী ও পানির ব্যবস্থা। গ্রামের পানির পাত্র ‘পিন-থালিয়া’ও ছিল তাঁদের পথের সহায়।
বেলের দল যখন সিগিরিয়া, কালুদিয়া পোকুনা, অভয়গিরিয়ার প্রাচীন স্থাপনা, পঙ্কুলিয়া ও তোলুভিলা বুদ্ধমূর্তিসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থানে কাজ করেছে, তখন তাঁদের শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শ্রীলঙ্কার অতীতকে নতুন করে আবিষ্কারের একটি বড় অধ্যায়। সিগিরিয়ায় খননকাজের সময় মৌমাছির আক্রমণের ঘটনাও তাঁদের কাজের ঝুঁকির একটি স্মরণীয় উদাহরণ হয়ে আছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রমিকদের স্মৃতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। তাঁদের অনেকেই ছিলেন দূরবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ। ইতিহাসের বর্ণনায় তাঁদের পরিচয় প্রায়ই শুধু শ্রমিক হিসেবে সীমাবদ্ধ থেকেছে। অথচ প্রত্নসম্পদ উদ্ধারের বাস্তব কাজটি তাঁদের হাত দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে।
এখানেই আমাদের ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা কেবল যাঁর নামে নির্মিত বা যাঁর আমলে প্রতিষ্ঠিত, তাঁরই কৃতিত্ব কি? নাকি সেই স্থাপনা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে যাঁরা শ্রম দিয়েছেন, তাঁদের অবদানও সমানভাবে স্মরণ করা উচিত?
প্রাচীন স্থাপত্যে নির্মাতার নাম না থাকার ঘটনাকে একসময় বিনয়ের সংস্কৃতি হিসেবে দেখা যেত। বিপরীতে আধুনিক সময়ে অনেক স্থাপনায় প্রকৃত নির্মাতা বা শ্রমিকের বদলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম গুরুত্ব’র সঙ্গে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যায়। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু ক্ষমতাবানদের স্মৃতিতে তৈরি হয় না; সাধারণ মানুষের শ্রমও ইতিহাস নির্মাণ করে।

তাই বেল পার্টির সদস্যদের স্মরণে একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাবকে কেবল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। আনুরাধাপুরার প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি ‘প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষার স্মরণপথ’ তৈরি করে সেখানে তাঁদের নাম সংরক্ষণ করা যেতে পারে। শ্রী মহাবোধি থেকে রুয়ানভেলিসেয়া পর্যন্ত এমন একটি পথ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দিতে পারে—প্রাচীন ঐতিহ্য উদ্ধার ও সংরক্ষণের পেছনে রাজা ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের পাশাপাশি ছিলেন অসংখ্য নামহীন শ্রমিকও।
ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে শুধু পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণ নয়; সেই স্থাপনা আমাদের সামনে ফিরিয়ে আনার পেছনে যাঁদের শ্রম ছিল, তাঁদের স্মৃতিও সংরক্ষণ করা। বেল পার্টির সদস্যদের প্রতি একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ সেই দায়িত্ব পালনেরই প্রতীক হতে পারে।












