কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নে চীন যে গতি ধরে রেখেছে, তাতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশটির প্রযুক্তি খাত। সেপ্টেম্বর মাসেই চীনের শীর্ষস্থানীয় ১০টি এআই প্রতিষ্ঠান নতুন করে মোট ১৬টি মডেল উন্মোচন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডিপসিকের মতো স্টার্টআপ এবং আলিবাবা, টেনসেন্ট ও শাওমির মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি।
এই হিসাবের মধ্যে শুধু নতুন করে তৈরি মডেলগুলো ধরা হয়েছে। ছবি ও অডিও তৈরির মডেলও এতে রয়েছে। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেলে সামান্য পরিবর্তন এনে প্রকাশ করা সংস্করণগুলো এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সতর্ক করার পরও চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের গতি কমায়নি। বরং শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই চীন প্রযুক্তিটির উন্নয়নকে এগিয়ে নিচ্ছে।
জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকসের অধ্যাপক ইচিরো সাতোর মতে, চীন এআইকে শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। ফলে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর সম্ভাবনা কম।
এআই মডেলের সংখ্যা বাড়ার চিত্র সাম্প্রতিক মাসগুলোর হিসাবেও স্পষ্ট। এআই মডেলের সক্ষমতা যাচাইকারী প্ল্যাটফর্ম বেঞ্চএলএমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনের আটটি বড় এআই প্রতিষ্ঠান মোট ২০টি বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম প্রকাশ করেছে। বছরের প্রথম তিন মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১৭টি মডেল।
অন্যদিকে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৫৯টি মডেল তৈরি করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে রয়েছে। তবে কয়েকটি মাসে নতুন মডেল তৈরির সংখ্যায় চীন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুলনামূলক ছোট ও হালকা এআই মডেলের ওপর জোর দেওয়া। এসব মডেলের লক্ষ্য হচ্ছে কম খরচে দ্রুত কাজ করা এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নমনীয়তা নিশ্চিত করা।
ডিপসিক গত মাসেই ভি৪.১-ফ্ল্যাশ মডেল প্রকাশ করেছে। এর আগের প্রজন্মের মডেলটি জুলাইয়ের শেষ দিকে উন্মোচন করা হয়েছিল। একই সময়ে বেইজিংভিত্তিক জেড ডট এআই প্রকাশ করেছে জিএলএম-৫.৩-ফ্ল্যাশএক্স এবং মিনিম্যাক্স এনেছে এম৩.১-ফ্ল্যাশ-প্রিভিউ। আলিবাবা ও শাওমিও একই ধরনের তুলনামূলক হালকা মডেল বাজারে এনেছে।
কম খরচের মডেলের চাহিদা বাড়ার পেছনে এআই এজেন্টের ব্যবহার বৃদ্ধিও একটি বড় কারণ। এআই এজেন্টকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়া করতে হয়, ফলে প্রতিটি কাজের খরচ কমানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণেই কম পরামিতি বা প্যারামিটারভিত্তিক হালকা মডেলগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
তবে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু কম খরচের মডেলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই সঙ্গে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ও বড় মডেল তৈরির প্রতিযোগিতাতেও রয়েছে।
আলিবাবা গত মাসে তাদের বার্ষিক ক্লাউড কম্পিউটিং অনুষ্ঠানে কিউওয়েন এআইয়ের আরও বড় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা জানায়। নতুন সংস্করণে ৫ ট্রিলিয়ন থেকে ১০ ট্রিলিয়ন পর্যন্ত প্যারামিটার থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির আগস্টে প্রকাশ করা সর্বশেষ প্রধান মডেলে ছিল ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার।
ফলে চীনের এআই খাতে এখন একই সঙ্গে দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—একদিকে কম খরচে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম ছোট মডেলের বিস্তার, অন্যদিকে আরও বেশি সক্ষমতা অর্জনের জন্য বিশাল আকারের মডেল তৈরির প্রতিযোগিতা। এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা বাড়লেও চীনের প্রযুক্তি খাত আপাতত উন্নয়নের এই দৌড় থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।












