ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না—এ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুতেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশ দ্রুত হামলার পক্ষে থাকলেও, শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের কেউ কেউ সম্ভাব্য ফলাফল, অস্ত্রের মজুত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে আরও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে লোহিত সাগরে হুথিরা জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর এই বিতর্ক সামনে আসে। তৎকালীন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল মাইকেল ‘এরিক’ কুরিলা দ্রুত সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি শুধু হুথিদের নয়, তাদের দীর্ঘদিনের সমর্থক ইরানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে তৎকালীন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল চার্লস কিউ. ব্রাউন জুনিয়র দ্রুত হামলায় যাওয়ার আগে নতুন করে সামরিক মূল্যায়নের পক্ষে ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক বিকল্প দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ফলাফল ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে যাচাই করার কথা বলেন।
এ সময় কুরিলা তাকে বলেন, “মূল্যায়নের সময় শেষ।” বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজনের কাছে এই মন্তব্য ছিল অপ্রত্যাশিত। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও কুরিলার অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তবে পেন্টাগনের ভেতরে শুধু হামলার প্রয়োজনীয়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কতটা প্রস্তুত—সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা সতর্ক করেছিলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালালে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে একই উদ্বেগ আরও বড় হয়ে ওঠে।

‘রাফ রাইডার’ অভিযান
২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ শুরু করেন। ৫১ দিনের ওই অভিযানে এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে হুথিদের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার, অস্ত্রের মজুত ও সামরিক স্থাপনাও ছিল। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, বিমান হামলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেসামরিক মানুষও নিহত হন।
ট্রাম্প ও হেগসেথ অভিযানটিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও পেন্টাগনের কিছু কর্মকর্তা এর লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট ও অর্জনযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় হুথিদের রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, অস্ত্রভান্ডার এবং উৎপাদন স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারও নিহত হন বলে মার্কিন পক্ষ দাবি করে।
অভিযানের আনুমানিক ব্যয় ছিল এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। এত বিপুল ব্যয়ের পরও হুথিরা লোহিত সাগর ও আশপাশের জলপথে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যায়। অভিযানের সময় অন্তত সাতটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হয় এবং সমুদ্র দুর্ঘটনায় দুটি এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান হারায় যুক্তরাষ্ট্র।
এর পাশাপাশি অভিযানের শুরুতেই ‘সিগন্যালগেট’ বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। রাফ রাইডার নিয়ে আলোচনা করা একটি সিগন্যাল গ্রুপে ভুল করে একজন সাংবাদিককে যুক্ত করা হয়েছিল। এতে অভিযানের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসার প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তী এক পর্যালোচনায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শক দপ্তর জানায়, ওই কর্মকাণ্ড সামরিক কার্যক্রমের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
হঠাৎ যুদ্ধবিরতি
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন অভিযান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেছিল বলে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের মে মাসে যুদ্ধবিরতি হয়।
ট্রাম্প তখন দাবি করেন, হুথিরা আর মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ওপর হামলা বন্ধ করবে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে অভিযান শেষ হওয়ার ধরন থেকেই বোঝা যায় যে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য শুরু থেকেই পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, অভিযান শেষ হওয়ার পর ইয়েমেনকে প্রায় পুরোপুরি গুরুত্বের বাইরে সরিয়ে দেয় প্রশাসন। দেশটির জন্য মার্কিন সহায়তাও কমানো হয় এবং ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূতের পদও পূরণ করা হয়নি। ওই কর্মকর্তার ভাষায়, তখনই সতর্ক করা হয়েছিল—ইয়েমেনকে উপেক্ষা করলে যুক্তরাষ্ট্রকে এর মূল্য দিতে হতে পারে।
হুথিরা আবার শক্তিশালী
যুদ্ধবিরতির পর হুথিদের সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তারা আবার ইয়েমেনে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দখল, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করার মতো কর্মকাণ্ড নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সোমবার হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। এর পাল্টা জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইয়েমেনি বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা যুদ্ধবিরতি ও আলোচনাকে শুধু সংঘাত থামানোর উপায় হিসেবে নয়, নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন এবং পরবর্তী সংঘাতের প্রস্তুতির কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, গত বছরের যুদ্ধবিরতিকে বিজয় হিসেবে দেখা উচিত ছিল না।
ইরান প্রসঙ্গে পুরোনো সতর্কতা নতুন অর্থ পাচ্ছে
হুথিদের নিয়ে পেন্টাগনের সেই পুরোনো মতবিরোধ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সামরিক অস্ত্রভান্ডারের ওপর চাপও বেড়েছে।
অন্যদিকে হুথিরা ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের হাতে বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর তাদের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
ইয়েমেন নিয়ে কাজ করা এক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন গত বছরের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে হুথিদের দেখিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর পর্যন্ত সংঘাত বাড়াতে প্রস্তুত। ফলে হুথিরা আরও বেশি কৌশলগত জায়গা পেয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষ মূল্যায়নটি তাই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—ট্রাম্প হয়তো হুথিদের সঙ্গে লড়াই থেকে সরে যেতে চাইছেন, কিন্তু হুথিরা এখনো ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের সংঘাত শেষ করেছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না।












