জীবন্ত কোষ ও জীবাণুকে এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘কারখানা’ হিসেবে ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক, জ্বালানি ও শিল্প উপকরণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির জৈব-অর্থনীতি খাতকে এগিয়ে নিতে ১১৮ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের নতুন তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জীববিজ্ঞানের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এমন সব পণ্য তৈরি করা, যেগুলো বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানি বা পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে টেকসই উড়োজাহাজ জ্বালানি, বিশেষায়িত রাসায়নিক, প্রসাধনী উপকরণ, কৃত্রিম রাবার এবং বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত উন্নত উপকরণ।
৫ অক্টোবর এই ‘বায়োইকোনমি ফান্ডিং ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণা করেন সিঙ্গাপুরের শিক্ষামন্ত্রী ডেসমন্ড লি। একই দিন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে (এনইউএস) ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজি উদ্বোধন করা হয়।
সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ড এবং দেশটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা এ*স্টার যৌথভাবে নতুন তহবিলের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এটি দেশটির জৈব-অর্থনীতি খাতের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় একক অর্থায়ন উদ্যোগ।
নতুন ১১৮ মিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি আগে থেকে থাকা প্রায় ৮২ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়নও এই খাতের প্রকল্পগুলোতে থাকবে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে জৈব-অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সিঙ্গাপুরের মোট বিনিয়োগ দাঁড়াবে প্রায় ২০০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার।
বিশ্বব্যাপী এই খাতের সম্ভাবনাও দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, জীববিজ্ঞানের মাধ্যমে তৈরি রাসায়নিক ও উপকরণের বৈশ্বিক বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জারমেইন লয় বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প খুঁজতে বিভিন্ন দেশে নতুন নিয়ম ও নীতিমালা চালু হওয়ায় জৈব-অর্থনীতির সম্ভাবনা বাড়ছে।
তিনি বলেন, কৃষি ফসল সুরক্ষা থেকে শুরু করে ভোক্তা পণ্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি এমন পণ্য তৈরিতে সাহায্য করছে, যেগুলো প্রচলিত পণ্যের তুলনায় আরও কার্যকর হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের নতুন তহবিল মূলত এমন গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে, যেখানে দেশটির বিশেষ সুবিধা রয়েছে। স্থানীয় কোম্পানি, নতুন উদ্যোগ ও বিনিয়োগকারীদের চিহ্নিত করা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিপুল কৃষিজ বর্জ্যকে সম্ভাব্য কাঁচামাল হিসেবে দেখছে সিঙ্গাপুর। এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পাম তেল, কাসাভা, ট্যাপিওকা ও ধানের বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যকে নতুন রাসায়নিক ও শিল্প উপকরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সিঙ্গাপুরের জৈব-অর্থনীতি উদ্যোগের চারটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, কৃষি ও শিল্পের অব্যবহৃত বর্জ্যকে কম খরচে টেকসই কাঁচামালে পরিণত করা। যেমন পামজাত বর্জ্য থেকে তৈরি ক্রুড গ্লিসারলকে নতুন পণ্য তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবাণু ও এনজাইমকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তারা নির্দিষ্ট রাসায়নিক উৎপাদনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয় লক্ষ্য শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করা। স্মার্ট পর্যবেক্ষণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনের সময় বর্জ্য কমানো এবং খরচ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
চতুর্থ লক্ষ্য হলো কোন কোন পণ্য বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব, তা চিহ্নিত করা। উচ্চমানের কৃত্রিম রাবার, প্রসাধনী উপকরণসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পণ্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে।
এ*স্টারের নতুন বায়োইকোনমি ইনোভেশন অফিস এসব প্রকল্প পরিচালনা করবে এবং সম্ভাবনাময় গবেষণাকে বাজারে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
অফিসটির অন্তর্বর্তীকালীন কর্মসূচি পরিচালক ওয়ং মিন হাও বলেন, এই উদ্যোগ পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি পাম তেল, কাসাভা, ট্যাপিওকা ও ধানের বর্জ্যকে সম্ভাব্য নতুন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন।
এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি রং বা অন্যান্য উপকরণের পরিবর্তে কৃষিজ ও জৈব বর্জ্য থেকে তৈরি বিকল্প পণ্য ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি ও রাসায়নিক খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির মোট উৎপাদন খাতের প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে জৈব-অর্থনীতি নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পগুলোকেও কাঁচামালের উৎস বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ দিতে পারে।
এদিকে এনইউএসে চালু হওয়া ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজি এই উদ্যোগের গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। কেন্দ্রটি জীবন্ত কোষকে ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করবে।
কেন্দ্রটি সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একত্র করছে। এর অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এনইউএস, নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি।
কেন্দ্রটি ২০২৩ সাল থেকে সাত বছরের জন্য ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রায় ৫০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের অনুদান পাচ্ছে। বর্তমানে ১৫০ জনের বেশি গবেষক, শিক্ষার্থী ও পেশাদার কর্মী কেন্দ্রটির বিভিন্ন গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। আরও প্রায় ৫০টি পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
এর মধ্যে প্রধান গবেষক, গবেষণোত্তর গবেষক, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, কারিগরি ও প্রকৌশল কর্মী, পরীক্ষাগার সহায়তাকর্মী এবং কেন্দ্র পরিচালনার বিভিন্ন পদ রয়েছে।
কেন্দ্রটির অন্যতম প্রধান গবেষণা প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জীববিজ্ঞানের প্রকৌশল প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। এর লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জৈব কাঁচামালকে জীবাণু ও এনজাইমের মাধ্যমে বিশেষায়িত রাসায়নিকে রূপান্তর করা।
এনইউএসের একটি গবেষণাগার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণাতেও ইতোমধ্যে জীবন্ত কোষকে ব্যবহার করে তন্তু ও কাপড় তৈরিতে প্রয়োজনীয় পলিমারের মূল উপাদান উৎপাদনের একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ হয়েছে।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ চ্যাং বলেন, নবায়নযোগ্য কাঁচামাল ও তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরির আরও টেকসই উপায় তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগের পেছনে মূল ভাবনা হলো জীববিজ্ঞানের অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্প উৎপাদন প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করা। এতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প যেমন তৈরি হতে পারে, তেমনি কৃষিজ বর্জ্যেরও অর্থনৈতিক মূল্য বাড়তে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে গবেষণা থেকে বাস্তব বাণিজ্যিক পণ্য তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সিঙ্গাপুর। উদ্যোগটি সফল হলে জৈব-অর্থনীতি দেশটির নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।












