২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর অপহৃত হয়েছিলেন যমজ ভাই গালি ও জিভ বেরম্যান। দুই বছর ধরে গাজায় বন্দি থাকার পর ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর মুক্তি পান তারা। বন্দিদশায় দীর্ঘ সময় একে অপরের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন দুই ভাই। ক্ষুধা, নির্যাতন, অন্ধকার সুড়ঙ্গে দিন কাটানোর পর এখন তারা ইসরায়েলে ফিরে নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন।
২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর মুক্তির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে তাদের। বয়স এখন ২৯। মুক্তির পরের এই এক বছর তাদের কাছে যেমন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সময়, তেমনি অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি সামলে নেওয়ারও সময়।
গালি ও জিভ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের কফর আজা কিবুত্জে থাকতেন। সেদিন হামলাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলে ঢুকে সেনাঘাঁটি, বসতি ও একটি সংগীত উৎসবে হামলা চালায়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।
গালি ও জিভও ছিলেন তাদের মধ্যে। অপহরণের সময় গালির বয়স ছিল ২৬। তারা কফর আজায় প্রযুক্তিবিদ হিসেবে একটি শব্দ ও আলোকসজ্জা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। হামলার আগে তাদের জীবন ছিল তুলনামূলক শান্ত ও স্বাভাবিক।
হামলার দিন গোলাগুলির শব্দ বাড়তে থাকলে তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমিলি দামারি একা থাকতে ভয় পাচ্ছিলেন। গালি তার কাছে ছুটে যান। কিছুক্ষণ পর হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে দামারির কুকুরকে হত্যা করে এবং তাকে গুলি করে আহত করে। অন্যদিকে জিভ যে নিরাপদ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ধোঁয়ায় কক্ষ ভরে গেলে তার সামনে দুটি পথ ছিল—ভেতরে থেকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া অথবা বাইরে বেরিয়ে আসা। শেষ পর্যন্ত তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন।
এরপর দামারি ও দুই ভাইকে একটি গাড়িতে তুলে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। চোখ বাঁধা থাকায় গাড়ির সামনের আসনে বসা জিভ তখনও জানতেন না যে গালিও একই গাড়িতে আছেন।
গাজায় পৌঁছানোর পর প্রথম দিনই গালিকে আলাদা করে নেওয়া হয়। জিভ ও দামারি আরও প্রায় ৪০ দিন একসঙ্গে ছিলেন। পরে তাদের সুড়ঙ্গে নিয়ে গিয়ে পুরুষ ও নারী জিম্মিদের আলাদা করা হয়।
বন্দিদশার বেশির ভাগ সময় দুই ভাইকে আলাদা রাখা হয়েছিল। তারা জানিয়েছেন, অন্ধকার সুড়ঙ্গে থাকতে হয়েছে, পর্যাপ্ত খাবার পাননি এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বন্দি থাকার সময় প্রত্যেকের ওজন প্রায় ২০ কেজি করে কমে যায়।
ছয় মাস পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি বাড়িতে প্রথমবারের মতো আবার দেখা হয় দুই ভাইয়ের। একে অপরকে দেখে তারা কেঁদে ফেলেন এবং জড়িয়ে ধরেন। তাদের সেই মুহূর্ত ভিডিও করা হয়েছিল, যা পরে প্রচারের জন্য ব্যবহার করার কথা ছিল। আরও কয়েকবার তাদের একসঙ্গে রাখা হলেও সেই সময়গুলো ছিল খুবই অল্প।
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর অবশেষে গাজা থেকে মুক্তি পান গালি ও জিভ। মুক্তির পর প্রথমবারের মতো তারা জানতে পারেন, তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা বেঁচে আছেন। তাদের মা তালিয়ার সঙ্গে সীমান্তের কাছে একটি সেনাঘাঁটিতে দেখা হয়।
ততদিনে কফর আজার চেহারাও বদলে গেছে। কিবুত্জটির প্রায় এক হাজার বাসিন্দার মধ্যে ৬০ জনের বেশি নিহত হন এবং আরও কয়েকজন অপহৃত হন। তাদের পুরোনো বাড়িও আর আগের অবস্থায় ছিল না।
তাদের বাবা পারকিনসন রোগ ও স্মৃতিভ্রংশে ভুগছেন। হাসপাতালে থাকার প্রথম সপ্তাহেই দুই ভাই তাকে দেখতে যান। দীর্ঘদিন পর ছেলেদের সামনে দেখে বাবা কেঁদে ফেলেন। সেই মুহূর্তকে গালি জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিগুলোর একটি হিসেবে মনে রেখেছেন।
মুক্তির পর তাদের জীবন ধীরে ধীরে নতুন পথে এগোতে শুরু করে। জিভকে দীর্ঘ সময় দাঁতের পরিচর্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, বন্দিদশায় প্রায় এক বছর দাঁত পরিষ্কার করতে পারেননি। পরে তার ব্যাপক দাঁতের চিকিৎসা করা হয়।
গালি এখন আইন, শাসন ও কূটনীতি নিয়ে পড়াশোনা করছেন। জিভ নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন এমন এক নারীর সঙ্গে, যিনি ৭ অক্টোবরের সংগীত উৎসবে হামলা থেকে বেঁচে গেছেন।
দুই ভাই শুধু নিজেদের জীবনেই ফেরার চেষ্টা করছেন না। তারা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং বিভিন্ন ইহুদি সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাদের ভাষায়, বন্দিদশায় কী ঘটেছিল তা বিশ্বকে জানানোও এখন তাদের দায়িত্ব।
কফর আজার বন্ধুদের মৃত্যুর শোকও তাদের তাড়া করে বেড়ায়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তিন জিম্মিকে ভুল করে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা। তাদের একজন ছিলেন অ্যালন শিমরিজ, দুই ভাইয়ের শৈশবের বন্ধু।
আরেকটি বিষয়ও তাদের মুক্তির অনুভূতিকে দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ করে রেখেছিল। গাজায় তখনও ইসরায়েলি পুলিশ কর্মকর্তা রান গভিলির মরদেহ ছিল। ৭ অক্টোবরের হামলার দিন আহত হওয়ার পর তাকে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গালি ও জিভ মনে করতেন, কোনো আহত বা নিহত সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে রাখা উচিত নয়। পরে ইসরায়েল তার মরদেহ উদ্ধার করলে তাদের কাছেও জিম্মি অধ্যায়ের শেষের অনুভূতি আসে।
মুক্তির পর এক বছর কেটে গেলেও অতীত পুরোপুরি পেছনে ফেলে আসতে পারেননি তারা। ৭ অক্টোবরের স্মৃতি, বন্ধুদের মৃত্যু, বন্দিদশার ভয় এবং দুই বছর হারিয়ে যাওয়া সময়—সবই তাদের জীবনের অংশ হয়ে আছে।
তবু তারা জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছেন। ফুটবল তাদের পুরোনো ভালোবাসার একটি অংশ। মুক্তির দিন হাসপাতালে নেওয়ার সময় হেলিকপ্টার চালককে তারা প্রিয় ক্লাব ম্যাকাবি তেল আবিবের ব্লুমফিল্ড স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে উড়তে বলেছিলেন। পরে নিয়মিত ফুটবল ম্যাচ দেখা ও নিজেরাও খেলার মাধ্যমে হারানো সময়ের কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডেও ঘুরে এসেছেন তারা। ৭ অক্টোবরের তৃতীয় বার্ষিকীর স্মরণ অনুষ্ঠানের সময় ইসরায়েলে থাকার বদলে কিছুটা দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। কারণ, দেশে ফিরে আসার পর এবারই প্রথম তারা ওই দিনের স্মৃতিকে নতুন করে সামনে থেকে দেখছিলেন।
তাদের ২৯তম জন্মদিনও ছিল আনন্দের। তেল আবিবের একটি অনুষ্ঠানে কয়েকশ স্বজন ও বন্ধু, তাদের মধ্যে মুক্তি পাওয়া কয়েকজন সাবেক জিম্মিও, যোগ দিয়েছিলেন।
তবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ এখনও শেষ হয়নি। গালি ও জিভের কাছে বন্দিদশার স্মৃতি কখনোই পুরোপুরি মুছে যাবে না। বরং সেই অভিজ্ঞতা তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
গালি বলেন, বন্দিদশার সময়টি তার জীবনের ভালো ও খারাপ—দুই দিক থেকেই চিরকাল একটি অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু এখন তাদের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি একটাই—তারা বেঁচে আছেন, আর জীবনের কোনো মুহূর্তকেই আর তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।












