ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আবারও ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী ১০ নভেম্বর বা তার পরপরই এই আলোচনা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য এই আলোচনায় যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বুধবার, ২১ অক্টোবর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন পুতিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে ওয়াশিংটনের নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পুতিনের সঙ্গে উইটকফের এটি ছিল নবম সরাসরি সাক্ষাৎ।
বৈঠকের শুরুতেই সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে রাশিয়ায় আটক যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়া হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই পুতিনের কাছে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরুর উদ্যোগের পাশাপাশি এই মুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, নতুন ত্রিপক্ষীয় আলোচনা মূলত যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্রীভূত হবে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক। রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান বন্ধ রাখা এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি করার দাবি জানিয়ে আসছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুতিনের অবস্থান পরিবর্তনের তেমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে, অন্যথায় দেশটিকে ‘খুব খারাপ পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধের অবসানে আলোচনার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। তিনি পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার আশা প্রকাশ করেছেন।
ইউক্রেনের প্রস্তাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় মস্কো
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের এক দিন আগে নরওয়ের অসলোতে জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও ন্যাটোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন উইটকফ। মার্কিন দূত পুতিনকে জানান, ওই আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন সেখানে নতুন কিছু ধারণা ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
তবে এসব উদ্যোগে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় রাশিয়া। পুতিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের বলেন, অসলো আলোচনার কিছু দিক মস্কোর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না বলে ইঙ্গিত মিলছে।
বৈঠকে উইটকফ পুতিনের পর্যালোচনার জন্য সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারণা-সংবলিত কিছু নথি নিয়ে যান। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও এ বিষয়ে নিজের কিছু ধারণা পুতিনকে জানাতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি ফোনের মাধ্যমে আলোচনায় যুক্ত হন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুতিনের বিশেষ বিনিয়োগবিষয়ক দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও। ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাছাকাছি রয়েছে বলে জানানো হয়।
ইরান ইস্যুতেও ট্রাম্পকে সহায়তার প্রস্তাব পুতিনের
ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনেও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন পুতিন। ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, উইটকফের সঙ্গে বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরানের সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ মোকাবিলায় মস্কো ভূমিকা রাখতে পারে।
পুতিনের মতে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব এবং তা প্রয়োজনীয়ও। তবে এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো নতুন সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তার জন্য বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগের পাশাপাশি এই প্রস্তাব অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে।
চীন সফরে ট্রাম্প-পুতিন-শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা
আগামী মাসে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বেইজিং ইতিমধ্যে এ ধরনের বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাস্তবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই বৈঠকের চূড়ান্ত সময়সূচি ও আলোচ্যসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে সম্ভাব্য বৈঠকটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কে বাড়ছে টানাপোড়েন
এদিকে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন বেড়েছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল রপ্তানি চুক্তি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জ্বালানির উচ্চমূল্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
এই চুক্তির পর ইউক্রেন অভিযোগ করে, রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটছে। তবে জেলেনস্কি বলেছেন, অসলো বৈঠকে এসব সমস্যা সমাধানে একটি সমঝোতা হয়েছে।
এরই মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, ধনকুবের ইলন মাস্ক গত সপ্তাহে ইউক্রেনের ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবার সামরিক কাজে ব্যবহৃত একটি সংস্করণের কার্যক্রম ধীর করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইউক্রেন রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি শনাক্ত করতে এই সেবার ওপর নির্ভর করে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদনটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
মাস্ক বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বা প্রেসিডেন্ট নিয়ে থাকেন। ট্রাম্পও এ সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে দায়ী করেননি। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার পুনর্ব্যক্ত করেন, ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করেনি।
সব মিলিয়ে, নতুন করে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা শুরুর সম্মতি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে ভূখণ্ড, ন্যাটো সদস্যপদ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রশ্নে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।












