ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত নাই বেভানের ওপর প্রায় তিন দশক ধরে নজরদারি চালিয়েছিল দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করার কারণে তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল গোয়েন্দা সংস্থাটি। সম্প্রতি প্রকাশিত গোপন নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ব্রিটেনের জাতীয় মহাফেজখানা নতুন কিছু গোপন নথি প্রকাশ করে। এসব নথি থেকে জানা যায়, ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৬০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেভানের সংসদীয় কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত চলাফেরা এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ওপর নজর রেখেছিল এমআই৫।
সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বেভান ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন যুদ্ধকালীন জোট সরকারের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের কারণে গোয়েন্দাদের সন্দেহ হয়েছিল, তিনি হয়তো কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল।
তবে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চালানোর পর বেভানের কাছ থেকে ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক কিছু পাওয়া যায়নি বলেই মনে হয়। প্রকাশিত নথিতে তাঁর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক নিয়ে গোয়েন্দাদের মূল্যায়নও উঠে এসেছে।
১৯৫৫ সালের একটি নোটে বলা হয়, ১৯৪৩ সালের পর থেকে বেভানের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্কের বিষয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ট্রটস্কিপন্থীরা তাঁকে নিজেদের সঙ্গে কাজ করানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
১৯৬০ সালে মৃত্যুবরণ করা বেভান ছিলেন ওয়েলসের সাবেক কয়লাখনি শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং সামাজিক সমতার পক্ষে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৪৮ সালে সরকারি অর্থায়নে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
এনএইচএস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রিটেনে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। দেশটির কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে এই ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
সংসদে অসাধারণ বক্তৃতা দেওয়ার দক্ষতার জন্য বেভান প্রশংসিত হলেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল যথেষ্ট বিতর্কিত। লেবার পার্টির ভেতরে যেমন তাঁকে নিয়ে মতভেদ ছিল, তেমনি ব্রিটিশ সমাজেও তিনি ছিলেন বিভাজন সৃষ্টিকারী এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
বেভানের মৃত্যুর দুই বছর পর, ১৯৬২ সালে তাঁর গোয়েন্দা নথি পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় লেখা হয়, “নাই বেভান যতটা বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁর ফাইলটি সেই তুলনায় আশ্চর্যজনকভাবে নিরীহ।”
নতুন প্রকাশিত নথির মধ্যে আরও কয়েকজন ব্যক্তির ওপর এমআই৫-এর নজরদারি ও তদন্তের বিবরণ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জার্মান কূটনীতিক ভলফগাং জু পুটলিৎস। তিনি অ্যাডলফ হিটলারের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য ব্রিটেনকে সরবরাহ করেছিলেন।
এ ছাড়া সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট এবং সন্দেহভাজন সহযোগীদের সম্পর্কিত নথিও প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ফ্র্যাঙ্ক বসার্ডের নাম রয়েছে। প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য রুশ গোয়েন্দাদের কাছে সরবরাহের অভিযোগে তাঁকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
নতুন নথিগুলো ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এগুলো দেখায়, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সরকারের সমালোচনার কারণে কীভাবে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় ছিলেন—যদিও তদন্তের নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর উদ্বেগের প্রমাণ মেলেনি।












