বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার ভারতের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। টানা আগের দুই কার্যদিবসের দরপতনের পর বৃহস্পতিবারও ভারতের প্রধান শেয়ারসূচকগুলো নিম্নমুখী ছিল।
বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে দেশটির প্রধান সূচক নিফটি ৫০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ২২ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৯০ পয়েন্টে নেমে আসে। অন্যদিকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স সূচক কমে দশমিক ৪৯ শতাংশ, দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৩৪৩ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে।
বাজারের দুর্বলতা ছিল প্রায় সর্বব্যাপী। ভারতের ১৬টি প্রধান খাতের মধ্যে ১৫টিতেই দরপতন হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও চাপ দেখা গেছে। এসব কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী সূচক দুটি করে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়াচ্ছে তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহভিত্তিক লেনদেনে দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ দশমিক ৭ ডলারে পৌঁছায়।
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সৌদি আরবে নতুন করে হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে অবস্থিত তাদের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কিছু কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
ভারতের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য, মুদ্রার বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে ছড়িয়ে পড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফাও চাপে পড়তে পারে।
সুদের হার বাড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে
মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে। বুধবার প্রকাশিত মুদ্রানীতি কমিটির সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যতে আরও সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে কমিটির সদস্যরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সুদের হার বাড়লে ঋণের ব্যয় বেড়ে যায়। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চয়েস ব্রোকিংয়ের কারিগরি গবেষণা বিশ্লেষক দীপেশ সারাওয়াগির মতে, বৈশ্বিক বাজারের দুর্বলতা এবং মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে স্থায়ী উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রেখেছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলই নির্ধারণ করতে পারে নিফটি নিম্নমুখী অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সমর্থন পাবে, নাকি সাম্প্রতিক পতন আরও দীর্ঘ হবে।
বড় কোম্পানির শেয়ারেও চাপ
বৃহস্পতিবার ভারতের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও দরপতন দেখা যায়। এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ারদর কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর কমেছে ১ শতাংশ।
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, রং উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং টায়ার নির্মাতাদের শেয়ারও নিম্নমুখী ছিল। এসব খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় ও কাঁচামালের দামের সঙ্গে জ্বালানি তেলের বাজারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের শেয়ারদর কমেছে ৬ শতাংশ। একাধিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির অর্থ সংগ্রহের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিমা বিতরণসংক্রান্ত বিধি সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
পণ্যের প্রচার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশ
কয়েকটি ভোগ্যপণ্য ও স্বাস্থ্যপণ্য কোম্পানির শেয়ারেও দরপতন হয়েছে। নেসলে ইন্ডিয়ার শেয়ারদর কমেছে ৩ শতাংশ। অ্যাবট ইন্ডিয়ার শেয়ারদর কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং জাইডাস ওয়েলনেসের কমেছে ২ শতাংশ।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি পণ্যের প্রচারমূলক দাবি নিয়ে নোটিশ দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রচারণায় কিছু দাবি বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে।
অ্যাবটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশ পাওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করা ওই প্রচারসামগ্রী সম্পর্কে কোম্পানিটি অবগত ছিল না এবং এতে তাদের সম্পৃক্ততাও ছিল না। মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানি ওই দাবিগুলো সমর্থন করেনি এবং বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়েছে।
নেসলে জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগাযোগে পণ্যের লেবেল নিয়ে আগের উদ্বেগগুলোই আবার তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত জবাব জমা দিয়েছে। তবে জাইডাস ওয়েলনেস এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব দেয়নি।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ভারতের শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি করেছে। আগামী দিনগুলোতে বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, তেলের দামের ওঠানামা এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলের ওপর।












