রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধের দাবি তুলেছেন তিনি। এর মধ্যেই ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ হামলায় তিন শিশুসহ ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গভর্নর জানিয়েছেন।
শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, রাশিয়ার শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বিশ্বজুড়ে ডিজেল সরবরাহে সমস্যা তৈরি করছে। তাঁর মতে, রাশিয়া বিশ্বের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত মস্কোকে আরও আক্রমণাত্মক হতে উৎসাহিত করেছে।

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পর রুশ হামলা
জেলেনস্কি শনিবার বলেন, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণার পরদিনই জাপোরিঝঝিয়ায় আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে মস্কো। তাঁর অভিযোগ, চাপ কমানোর যেকোনো পদক্ষেপকে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। এ পরিস্থিতিতে মস্কোর প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রুশ হামলায় জাপোরিঝঝিয়ায় একটি আবাসিক ভবনের অংশ ধসে পড়ে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন। শিশুটির দাদা আনাতোলি চুমনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে শিশুটির জন্মদিন হওয়ার কথা ছিল।
এ সপ্তাহে ইউক্রেনে এটি ছিল ব্যাপক প্রাণহানির তৃতীয় হামলা। বুধবার ও বৃহস্পতিবার রুশ হামলায় প্রায় ৮০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ক্রামাতোরস্কে বোমা হামলায় অন্তত ৩০ জন এবং কিয়েভের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পূর্বে প্রিলুকিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও ২২ জন নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকন বলেছেন, কংগ্রেস সম্প্রতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে, তা শিথিল না করে বরং আরও কঠোর করা উচিত।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই চুক্তির ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা সীমিত। রাশিয়ার শোধনাগারগুলো হামলার শিকার না হলে দেশটি সাধারণত যে পরিমাণ ডিজেল রপ্তানি করে, চুক্তির আওতায় সেই পরিমাণের তুলনায় সরবরাহ কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা জোরদারের ঘোষণা
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম শনিবার জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করবে যুক্তরাজ্য। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই নেতার সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথাও রয়েছে।
শুক্রবার মায়ামিতে ইউক্রেন, ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যেই ট্রাম্প ডিজেল চুক্তির ঘোষণা দেন। জেলেনস্কি বলেছেন, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ কিয়েভকে বিস্মিত করেছে।
অন্যদিকে, পুতিন শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর জানান, ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে অবিলম্বে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মস্কো সফর করতে পারেন।
ট্রাম্প অবশ্য শান্তিচুক্তি না হওয়ার জন্য জেলেনস্কিকে দায়ী করেছেন। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জেলেনস্কির এমন একজন উত্তরসূরি প্রয়োজন, যিনি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।












