ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে তরুণদের একটি আন্দোলন। রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানী নয়াদিল্লিতে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আগের দিন বিক্ষোভ ঠেকাতে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছিল পুলিশ। তবে রোববার মেট্রোরেল স্টেশনগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও স্বাভাবিক হয়েছে।
নির্বাচনী তালিকা সংশোধন ও ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—দুই পক্ষই কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আন্দোলনের নেতাদের মুক্তি

বিক্ষোভের জন্য হাজারো মানুষ জড়ো হওয়ার পরিকল্পনার মধ্যে শনিবার দিল্লিতে বিমান অবতরণের পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সংগঠনটির আরও দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে আটক করা হয়। রোববার ভোরে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। পরে এক বছরের জন্য শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয় বলে সংগঠনটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান।
আটক হওয়া কর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ ধ্রুব রাঠিও মধ্যরাতের পর মুক্তি পান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভবিষ্যতে আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার শর্তে তাঁকে ছাড়া হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে পুলিশ। রোববারও শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার আটক অধিকাংশ ব্যক্তিকে রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ ১৩ কোটি নাম
নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতীয় সংবাদপত্র ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার বিষয়ে কমিশনের দুই উপপ্রধান অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ চলছিল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিজেপি জানিয়েছে, যাচাই কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে গেছেন এবং ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম ভোটার ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এসব ভোটার সাধারণত হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে সমর্থন করেন না বলেই তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার প্রভাব রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিজেপির দাবি, বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ, ভারতের আপত্তি
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ভারতের বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকেরা নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করেছেন। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি সংস্থাও।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের অবস্থানকে ‘বাছাই করা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, এ ধরনের মন্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ।
অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি পরে চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলনকারী সংগঠনে পরিণত হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তাদের আগের আন্দোলনের পর মোদির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। এবার নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। তারা বর্তমান কর্মসূচিকে ‘সিজন ২’ নামে অভিহিত করছে।












