২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই হামলায় মানুষের প্রাণহানি, ভয়াবহতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক মহলকে স্তম্ভিত করেছিল। কিন্তু এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে হামাসের প্রাথমিক হামলার স্মৃতি অনেকাংশে আড়ালে চলে গেছে। বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে এখন যে দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েলের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ এবং তার মানবিক পরিণতি।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে গাজায় বিপুল প্রাণহানি, জনবসতি ধ্বংস এবং পরে লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিস্তার ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমশ একঘরে করে ফেলেছে। আধুনিক ইতিহাসে দেশটি সম্ভবত আর কখনো এত বিস্তৃত কূটনৈতিক বিরোধিতা ও রাজনৈতিক অনাস্থার মুখে পড়েনি। বিশেষ করে মধ্যপন্থী ও মধ্য-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন এখন স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। চলতি মাসের নির্বাচনে দেশটির ভোটাররা এমন সরকার বেছে নিতে পারেন, যারা আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে। অথবা নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোটকে আবার ক্ষমতায় এনে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়াতে পারেন। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সমর্থন করার যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ছিল, বিশেষত ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে, গাজা যুদ্ধ সেই ঐকমত্যের ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় থেকেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের প্রতি দলটির সামগ্রিক সমর্থন এত দিন খুব ধীরগতিতে বদলেছে। গাজায় ইসরায়েলের অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সীমিত চাপ প্রয়োগের নীতি সেই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইসরায়েলকে সমর্থন করলেও দেশটির ডানপন্থী সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত জে স্ট্রিটের সভাপতি জেরেমি বেন-আমির মতে, ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থানে পরিবর্তন প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই পরিবর্তন এখন আর কেবল দলের প্রান্তিক বামপন্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মূলধারার রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়ছে।
ওয়াশিংটনে বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
মার্কিন কংগ্রেসে সাম্প্রতিক কয়েকটি উদ্যোগ এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরকে প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করার একটি প্রস্তাব সিনেটে উত্থাপিত হয়েছিল। রিপাবলিকানদের বিরোধিতায় সেটি পাস না হলেও পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান ছাড়া সব ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
ইসরায়েলের কাছে ভারী বোমা ও সাঁজোয়া বুলডোজার বিক্রি বন্ধ করা কিংবা দেশটিকে দেওয়া সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তাবও কংগ্রেসে সমর্থন পেয়েছে ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশের কাছ থেকে। এসব উদ্যোগ সফল হয়নি, কারণ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতা ছিল প্রবল। তবু ভোটের ধরন দেখিয়েছে, ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন করার পুরোনো অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আর আগের মতো শক্তিশালী নয়।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবও উঠেছে কংগ্রেসের দুই কক্ষে। প্রস্তাবটির অনেক সমর্থক দলের বামপন্থী অংশের হলেও সিনেটে এর অন্যতম প্রধান সমর্থক ক্রিস কুনস। তিনি একজন মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বাইডেনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি যে কেবল দলের বাম অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এমন ব্যাখ্যা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
২০২৮ সালের নির্বাচনে বড় পরীক্ষা
২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলনীতি অন্যতম প্রধান বিতর্ক হয়ে উঠতে পারে। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলা হবে কি না, তা প্রার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। তবে শব্দটি ব্যবহারের প্রশ্নে মতভেদ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দলটির বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরায়েলকে মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, তা বন্ধ করার দাবি ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের ন্যূনতম অবস্থানে পরিণত হতে পারে। আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রার্থীরা ইসরায়েলের কাছে আক্রমণাত্মক অস্ত্রের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র বিক্রিও পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে দাঁড়াতে পারেন। অন্যদিকে, দলের মধ্যপন্থীরা সর্বাত্মক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করলেও বিদ্যমান মানবাধিকার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং মার্কিন সহায়তার সঙ্গে নতুন শর্ত যুক্ত করার দাবি তুলতে পারেন।
এর মধ্যে থাকতে পারে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং গাজায় ইসরায়েলের আরও ভূখণ্ড দখল ঠেকানোর ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ইসরায়েলকে সমর্থন করা আর দেশটির সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরির চাপ বাড়ছে।
জনমতের পরিবর্তন আর শুধু আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মনোভাবের বড় ধরনের রূপান্তর। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণকারী ডেমোক্র্যাটদের হার ২০২২ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে চলতি বছরে বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্যালাপের জরিপেও দেখা গেছে, ২০২২ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতির প্রশ্নে প্রায় সমান বিভাজন ছিল। এখন ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ডেমোক্র্যাটের সংখ্যা ইসরায়েলিদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের প্রায় চার গুণ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পিউয়ের আন্তর্জাতিক জরিপে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বামপন্থী জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশের বেশি এবং মধ্যপন্থীদের অন্তত ৭০ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাম্প্রতিক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেন। জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ভাষণের সময় বিভিন্ন প্রতিনিধির সভাকক্ষ ত্যাগের ঘটনাও আন্তর্জাতিক অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়েছে।
রিপাবলিকান পার্টিও পুরোপুরি এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি কম থাকলেও পিউয়ের জরিপ বলছে, ৫০ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের প্রায় ৬০ শতাংশের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত নিজের দলের ভেতরে এই বিতর্ক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন। তবে ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রার্থী বাছাইয়ের লড়াইয়ে বিষয়টি আবার সামনে আসতে পারে।
নিরাপত্তার বাস্তবতা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ অনেক মানুষও স্বীকার করেন, দেশটি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা সেই বাস্তবতার নির্মম প্রমাণ। কিন্তু নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বকে অস্বীকার করার অনুমতি দেয় না।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু যুদ্ধের সামরিক ফলাফল নয়; বরং তাঁর নেতৃত্বে ইসরায়েল কতটা আন্তর্জাতিক আস্থা হারিয়েছে। চলতি মাসের নির্বাচনে ইসরায়েলিরা যদি মধ্যপন্থী সরকার বেছে নেন, তাহলে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরলে দেশটির আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।












