ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আরোপিত আকাশপথের অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করেছে বলে দাবি করেছে তেহরান টাইমসের এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ। এতে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন আনসারুল্লাহর সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতা এখন শুধু দেশটির সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নিবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, অবরোধের জবাবে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করার কৌশল ইয়েমেনকে আঞ্চলিক দর-কষাকষিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। তবে এতে উপস্থাপিত সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাবের দাবিগুলো নিবন্ধটির নিজস্ব মূল্যায়ন; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত নয়।
তেহরান সফর থেকে নতুন সমীকরণের দাবি
নিবন্ধে বলা হয়েছে, আনসারুল্লাহর একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেহরানে যায়। ফেরার পথে সানা বিমানবন্দরে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালানোর পর প্রতিনিধিদলকে হোদেইদা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয়।
লেখকের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ ইয়েমেনের ওপর আকাশপথের অবরোধের বিরুদ্ধে নতুন পর্যায়ের প্রতিরোধের সূচনা করে। এর মধ্য দিয়ে বার্তা দেওয়া হয় যে, অবরোধ অব্যাহত থাকলে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিবন্ধে এই কৌশলকে ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখাটিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের কোনো সমাধান হলে তা যেন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোটের স্বার্থ ও অবস্থানও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাব আল-মান্দেব ও হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে আনসারুল্লাহর অগ্রযাত্রা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি নিবন্ধে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের দাবি, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের ফলে আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোটের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। অন্যদিকে, বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, এই দুই নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রতিরোধ জোটের প্রভাব তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের পক্ষে নিবন্ধে বিস্তারিত তথ্য বা স্বাধীন যাচাইয়ের ভিত্তি দেওয়া হয়নি। ফলে একে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতার বদলে লেখকের মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জ্বালানি থেকে বিশ্ববাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
নিবন্ধটির যুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু সামরিক সংঘাতেই সীমিত থাকে না। জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে তেলের দাম বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোগ্যপণ্য, খাদ্য, ধাতু ও সারের বাজারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার ও আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
লেখকের মতে, এই বাস্তবতা আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোটকে শুধু সামরিক শক্তি হিসেবেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম একটি পক্ষ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব নৌপথে প্রকৃত বিঘ্নের মাত্রা, জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। নিবন্ধে এ বিষয়ে কোনো পরিমাণগত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়নি।
সৌদি আরবের ওপর চাপ ও সম্ভাব্য সমঝোতা
নিবন্ধে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলাকে ইয়েমেনের পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের মতে, হরমুজ ও লোহিত সাগর ঘিরে অনিশ্চয়তা সৌদি আরবের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়াতে পারে।
এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে একাধিক যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চাইবে না। সে কারণে ওয়াশিংটন সব আঞ্চলিক সংঘাতকে একসঙ্গে সমাধানের বদলে পৃথকভাবে সমঝোতার পথ খুঁজতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চুক্তি হলেও ইয়েমেনের সংকট সমাধানে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলাদা সংলাপ প্রয়োজন হতে পারে বলে নিবন্ধে মত দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
লেখকের চূড়ান্ত মূল্যায়ন, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। আনসারুল্লাহর অবস্থান ও ভূমিকার স্বীকৃতি এবং সৌদি-ইয়েমেন সংলাপকে সম্ভাব্য সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ইয়েমেনের সামরিক অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিবন্ধে যেসব দাবি করা হয়েছে, সেগুলো লেখকের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণের অংশ। এসব পরিবর্তন বাস্তবে কতটা ঘটবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্ভাব্য সমঝোতার ওপর।












