যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের প্রার্থীদের ওপর। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে যুদ্ধের যৌক্তিকতা, সামরিক ব্যয়, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না কংগ্রেস।
ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের দ্বিতীয় নির্বাচনী এলাকা এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী জেন কিগ্যান্সের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলেইন লুরিয়া। দুজনই সাবেক নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। কিগ্যান্স দুই মেয়াদ ধরে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। অন্যদিকে, লুরিয়া এর আগে এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এই নির্বাচনী এলাকার গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবিমানঘাঁটি রয়েছে, যেখান থেকে সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছিল। এলাকার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন বা সামরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখানকার ভোটারদের কাছে দূরের কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা নয়; বরং তাঁদের পরিবার, কর্মজীবন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়।
কিগ্যান্সের এক নির্বাচনী সমাবেশে একজন ধর্মযাজক প্রার্থনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে এবং সেখানে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর আশা, এর ফলে দেশটিতে খ্রিষ্টান গির্জার সংখ্যা বাড়বে। এরপর কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা বক্তব্য দেন। সবশেষে মঞ্চে আসেন কিগ্যান্স। তিনি নিজের পুনর্নির্বাচনের লড়াইকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেন।
তবে এই নির্বাচনে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি। কিগ্যান্স প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে, লুরিয়া ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করছেন। কিগ্যান্সের অভিযোগ, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সামরিক বাহিনীর স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন।
এই কৌশল কিগ্যান্সের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় আসনটি এমন একটি এলাকা, যেখানে দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণত বেশ হাড্ডাহাড্ডি হয়। কিগ্যান্স তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকার জন্য পরিচিত। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কেউ কেউ তাঁর এই কাজের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু এবার তিনি নিজের পুনর্নির্বাচনের লড়াইকে অনেকটাই ট্রাম্প এবং তাঁর ইরান যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এই নির্বাচনী এলাকায় এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। অথচ এর এক বছর পর ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট গভর্নর অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হন। এই ফল ডেমোক্র্যাটদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। তাঁদের ধারণা, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কিগ্যান্সের মতো রিপাবলিকান প্রার্থীদের চাপে ফেলতে পারবেন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রচারে সহায়তা করতে সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতারাও এগিয়ে আসছেন। ৬ অক্টোবর অ্যারিজোনার সিনেটর, সাবেক নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমানচালক ও মহাকাশচারী মার্ক কেলি ভার্জিনিয়া বিচে লুরিয়ার সঙ্গে প্রচার চালান। স্থানীয় সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের সঙ্গে এক আলোচনায় তাঁরা যুদ্ধের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে ছিল স্থানীয় জাহাজ নির্মাণশিল্পের ওপর প্রভাব, সামরিক প্রস্তুতি, গোলাবারুদের মজুত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি।
লুরিয়ার আশঙ্কা, বিমানবাহী রণতরিগুলোকে পরপর দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখার কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে নরফোকের নৌঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এলাকার জন্য এই বিষয়টি উদ্বেগের। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে ব্যস্ত থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমত ও কংগ্রেসের নিষ্ক্রিয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভোটার ইরান যুদ্ধকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন। তাঁদের কাছে এই যুদ্ধের সঙ্গে ইরাক যুদ্ধের ব্যর্থতার তুলনা উঠে আসছে। ইরাক যুদ্ধ প্রায় নয় বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং সেখানে চার হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হন। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত, বিপুল ব্যয় এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধানের অভাব সেই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সামরিক অভিযানে পরিণত করেছিল।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধ কত দিন চলবে, এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, কতটা সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে এবং কীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানো হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর চান সমালোচকেরা।
তবে জনমতের অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস কার্যকরভাবে ট্রাম্পকে চাপ দিতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক মেরুকরণ। রিপাবলিকানদের বড় অংশ প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে সমর্থন করছেন। ফলে যুদ্ধের সমালোচনা করলেও দলীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে অনেকেই অনিচ্ছুক।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে কথা বললেও অধিকাংশই ট্রাম্পের প্রতি দৃঢ় সমর্থন বজায় রেখেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করলে দলীয় সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। আবার যুদ্ধের বিরোধিতা করলে প্রতিপক্ষ তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর স্বার্থবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কিগ্যান্সের বক্তব্যে এই রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি লুরিয়ার যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে ইরানের প্রতি সমর্থন এবং সামরিক বাহিনীর বিরোধিতা হিসেবে তুলে ধরছেন। এর মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ককে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর দেশপ্রেম ও নিরাপত্তাবিষয়ক অবস্থানের প্রশ্নে পরিণত করতে চাইছেন।
ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে কী করতে পারবে?
নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি পরিবর্তন করানো সহজ হবে না। কারণ, প্রেসিডেন্টের হাতে সামরিক বাহিনী পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসের হাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সেগুলো প্রয়োগ করতে রাজনৈতিক সাহস ও দলীয় ঐকমত্য প্রয়োজন।
কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলোর একটি হলো বাজেট। সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের ভূমিকা রয়েছে। চাইলে তাঁরা সামরিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন কিংবা নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দের ওপর শর্ত আরোপের চেষ্টা করতে পারেন।
কিন্তু যুদ্ধ চলার সময় সামরিক ব্যয় আটকে দিয়ে প্রেসিডেন্টকে চাপে ফেলা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক হতে পারে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, কোনো প্রেসিডেন্ট অজনপ্রিয় হলেও যুদ্ধের মধ্যে সামরিক ব্যয় আটকে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ভালো দেখায় না। কারণ, বিরোধীরা তখন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে সেনাসদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তা বন্ধ করার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
এই বাস্তবতা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় বাধা। একদিকে তাঁরা যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় অর্থ বন্ধ করার দায় নিতে চান না। ফলে জনমতের অসন্তোষকে সরাসরি নীতিগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আইন পরিবর্তনের দাবি
কংগ্রেসের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আরেকটি উপায় হতে পারে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনসংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর কংগ্রেস সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনসংক্রান্ত আইন বা এইউএমএ (AUMF) পাস করে। এর মাধ্যমে হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিস্তৃত ক্ষমতা হোয়াইট হাউসকে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসন এই ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করেছে। আইনটির প্রয়োগ নিয়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে খুব বেশি বাধা দেওয়া হয়নি বলে সমালোচকেরা মনে করেন। তাঁদের আশঙ্কা, নির্বাহী বিভাগের হাতে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা ক্রমে বিস্তৃত হওয়ায় যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তে আইনপ্রণেতাদের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে এইউএমএকে সরাসরি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি প্রধানত সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে শুধু এইউএমএ সংশোধন করলেই ইরান যুদ্ধের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমিত হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের বিতর্কে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউ জার্সির উত্তরাঞ্চলে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত একটি প্রতিনিধি পরিষদের আসনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিবেচিত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেট এই বিষয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক নৌবাহিনীর হেলিকপ্টারচালক বেনেটের মতে, এইউএমএ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের ন্যূনতম নৈতিক সাহসও দেখাতে অনীহা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস যেন নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: কোনো প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান শুরু করলে তার যৌক্তিকতা, লক্ষ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি যাচাই করার দায়িত্ব কি কেবল নির্বাহী বিভাগের, নাকি নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদেরও কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত?
তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্পকে জবাবদিহির মুখে ফেলার চেষ্টা
নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তাঁদের হাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় থাকবে—তদন্ত ও তদারকি। কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি শুনানি আয়োজন করতে পারে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তলব করতে পারে এবং যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নথি ও ব্যাখ্যা চাইতে পারে।
মার্ক কেলি ও এলেইন লুরিয়া সাক্ষাৎকারে এমন তদন্তের সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। তাঁদের মতে, ইরান যুদ্ধ কেন শুরু করা হলো, কীভাবে এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং যুদ্ধ শেষ করার কোনো কার্যকর কৌশল রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশাসনের জবাব দেওয়া উচিত।
কেলি কয়েকটি বিষয়কে বিশেষভাবে তদন্তের উপযোগী বলে মনে করেন। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিষয়ক সিদ্ধান্তে যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির পরিমাণ, গোলাবারুদের ঘাটতি কতটা গুরুতর, এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা আদৌ আছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বর্তমান যুদ্ধের মূল্যায়নের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে, তার ক্ষেত্রেও তা প্রভাব ফেলতে পারে। যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ, সামরিক সম্পদের ব্যবহার এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে কংগ্রেসের তদন্ত যে সব সময় নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তা নয়। অতীতেও যুদ্ধকালীন ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে তদন্তের তথ্য ব্যবহার করার নজির রয়েছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় বাইডেন প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে রিপাবলিকানদের তদন্ত। ওই তদন্ত থেকে পাওয়া তথ্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারে কমলা হ্যারিসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের যুদ্ধপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে তদন্ত শুরু করলে তা শুধু সামরিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের রাজনৈতিক অবস্থানও আলোচনায় আসতে পারে।
বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁরা রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। ফলে ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
কেলির মতে, এই যুদ্ধের সিদ্ধান্তে এমন মাত্রার বেপরোয়া মনোভাবের আশঙ্কা রয়েছে যে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, ডেমোক্র্যাটদের কাছে বিষয়টি শুধু নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের প্রশ্ন নয়; বরং প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ও।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কি বদলাবে যুদ্ধের হিসাব?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন দুটি প্রবণতা পাশাপাশি চলছে। একদিকে, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি খরচ, সামরিক প্রস্তুতির ওপর চাপ এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে, দলীয় আনুগত্য ও জাতীয় নিরাপত্তার রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে কংগ্রেসের অনেক সদস্য প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে চাইছেন না।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এই পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে যুদ্ধ নিয়ে শুনানি, তদন্ত এবং প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ বাড়বে। সামরিক ব্যয়ের ওপর নজরদারি এবং ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগও জোরদার হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা, সামরিক ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং কংগ্রেসের ভেতরের মতবিরোধ—সব মিলিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে।
ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় আসনের নির্বাচন তাই শুধু একজন রিপাবলিকান ও একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর লড়াই নয়। এটি হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের প্রতি ভোটারদের মনোভাব যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সঙ্গে এটি পরীক্ষা করবে, যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেস নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর কতটা কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইরান যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত কে নেবে, সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে এবং সংঘাতের অবসানের পরিকল্পনা না থাকলে প্রেসিডেন্টকে কীভাবে জবাব দিতে বাধ্য করা হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পথ খুলে দিতে পারে, যদিও বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কংগ্রেসের কার্যকর ভূমিকা।












