বিশ্বের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি এখনো মার্কিন ডলার। তবে এই মুদ্রার ওপর নির্ভরতার সুবিধার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকিও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জটি শুধু ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনো মুদ্রা ব্যবহার করা নয়; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বজায় রেখে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখা, পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বহিরাগত ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়ানো।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ, যা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ নামে পরিচিত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তার কারণে নতুন গতি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের কারণে এই পরিবর্তন দ্রুত ঘটবে না। বিশ্বব্যবস্থায় ডলারের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো মুদ্রার উত্থানও এখনো নিশ্চিত নয়।
তাই ভারতের কৌশল হওয়া উচিত সতর্কতার সঙ্গে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থায়নে ডলারের ব্যবহার বজায় রেখেই বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বহিরাগত সংকটের মুখে অর্থনীতির ঝুঁকি কমানো যায়।

কেন এখনো বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য
একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রভাব নির্ভর করে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতির আকারের ওপর নয়। মুদ্রাটিকে বিনিময়ের মাধ্যম, হিসাবের একক এবং সম্পদ সংরক্ষণের উপায় হিসেবে নির্ভরযোগ্য হতে হয়। গভীর আর্থিক বাজার, পর্যাপ্ত তারল্য, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুই একটি মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে ডলারের উত্থান আরও সুসংহত হয়। ওই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার বিনিময় হার ডলারের সঙ্গে যুক্ত রাখত এবং ডলারকে সোনার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থা ভেঙে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ অর্থনীতি, বিস্তৃত আর্থিক বাজার এবং সরকার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ সম্পদের প্রাপ্যতা ডলারের অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা অন্য মুদ্রার পক্ষে অনুকরণ করা কঠিন। ২০২৫ সালে বিশ্বের দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ছিল ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১২ সালে এই হার ছিল ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ডলারের অংশ কমলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে তার আধিপত্য শেষ হয়ে যায়নি।
আন্তর্জাতিক লেনদেন, বাণিজ্য অর্থায়ন ও আন্তসীমান্ত বিনিয়োগেও ডলারের ব্যবহার ব্যাপক। বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান ডলারে লেনদেন করে, কারণ অন্যরাও এই মুদ্রা ব্যবহার করে। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিজেই আরও ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।
আর্থিক ক্ষমতা যখন কৌশলগত ঝুঁকি
ডলারের ব্যাপক আন্তর্জাতিক ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, ডলারে লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধব্যবস্থা থেকে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করার ঘটনা বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় বিদেশে রাখা কোনো দেশের সম্পদও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে কি না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এখন শুধু আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও।
মার্কিন মুদ্রানীতিও অন্য দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার পরিবর্তিত হলে আন্তর্জাতিক পুঁজিপ্রবাহ, বিনিময় হার এবং অন্যান্য দেশের ঋণ নেওয়ার ব্যয় প্রভাবিত হয়। ২০১২-১৩ সালে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের আর্থিক প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্তের পর ভারতসহ বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতি বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি ‘টেপার ট্যানট্রাম’ নামে পরিচিত।
ভারতের মতো বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এসব ঘটনা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের কাজকে আরও জটিল করে তোলে। তাই একটি মাত্র আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

কেন এখনো ডলারের বিকল্প তৈরি হয়নি
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইউরো দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হলেও ইউরোপের আর্থিক কাঠামোয় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজারের খণ্ডিত অবস্থা এবং অর্থ পরিশোধের কিছু ব্যবস্থায় মার্কিন পরিষেবা প্রদানকারীদের ওপর নির্ভরতা।
চীন আন্তসীমান্ত লেনদেনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির মাধ্যমে ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য অর্থায়নে ইউয়ানের অংশ ছিল ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশে পৌঁছায়।
তবে ইউয়ানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের পুঁজিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, মূলধন হিসাবের পূর্ণ রূপান্তরযোগ্যতার অভাব এবং আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এমন মুদ্রা চান, যার মাধ্যমে সহজে অর্থ স্থানান্তর, বিনিয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ নগদায়ন করা যায়।
স্বর্ণও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার একটি উপায়, বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক সংকটের সময়। কিন্তু স্বর্ণ দিয়ে আধুনিক আন্তর্জাতিক মুদ্রার সব কাজ করা সম্ভব নয়। ডিজিটাল মুদ্রা ও বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থা লেনদেনকে সহজ করতে পারে, তবে তারল্য, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগুলোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ফলে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমুখী হয়ে উঠলেও ডলারের জায়গা নেওয়ার মতো কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের পথে ভারতের উদ্যোগ
বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের স্থান দখল করার লক্ষ্য ভারত গ্রহণ করেনি। দেশটির কৌশল বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে ঝুঁকি কমানো।
এই কৌশলের একটি অংশ হলো রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানো। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ২২টি দেশের জন্য বিশেষ ভোস্ট্রো রুপি হিসাব খোলার অনুমতি দিয়েছে, যার মাধ্যমে ভারতীয় মুদ্রায় আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব। উভয় পক্ষ সম্মত হলে এ ধরনের ব্যবস্থা লেনদেনে ডলারের প্রয়োজন কমাতে পারে।
ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইও আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এর ব্যবহার এখনো মূলত খুচরা পর্যায়ের লেনদেনে সীমিত। একই সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল রুপি পরীক্ষা করছে এবং আন্তসীমান্ত লেনদেন দ্রুত ও কার্যকর করতে অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে রুপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। ভারতের রপ্তানি সক্ষমতা, আর্থিক বাজারের গভীরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি সরকার, প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের কাছে রুপিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে এসব ক্ষেত্রের উন্নয়ন জরুরি।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা
তেল বাণিজ্য দেখায়, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত মুদ্রাব্যবস্থা পরিবর্তন করা কতটা কঠিন। ডলারে তেলের মূল্য নির্ধারণ এবং তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় মার্কিন আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগের প্রথা ঐতিহাসিকভাবে ডলারের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
তবে জ্বালানি উৎপাদনে পরিবর্তন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এই ব্যবস্থার কিছু ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। ভারত আমদানিনির্ভর জ্বালানি চাহিদা পূরণে রাশিয়ার তেল ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং রুপি, রুবল ও ইউয়ানসহ বিভিন্ন মুদ্রায় লেনদেনের পথ খুঁজেছে।
কিন্তু জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থেকে আলাদা করা যায় না। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মার্কিন হুমকি দেখিয়েছে, কীভাবে মুদ্রা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি ভারতকে কূটনৈতিক নমনীয়তা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, নতুন ব্যবস্থা যেন পুরোনো নির্ভরতার বদলে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি না করে।
আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা নয়, প্রয়োজন অর্থনৈতিক সংস্কার
দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। দ্রুত প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি, গবেষণা ও উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, গভীর পুঁজিবাজার এবং আর্থিক খাতের সংস্কার রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়াবে।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি সামলাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে ডলার থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা ভারতের সেই বাজার ও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যার ওপর দেশটির অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
তাই ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতীকী ডি-ডলারাইজেশন নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতা বাড়ানো। যেখানে ডলার সুবিধাজনক, সেখানে তার ব্যবহার বজায় রেখে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং রিজার্ভের গঠনে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে।
ডলারের আন্তর্জাতিক প্রভাব সময়ের সঙ্গে কমতে পারে। কিন্তু এর বিস্তৃত আর্থিক কাঠামো, গভীর বাজার এবং ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে দ্রুত অন্য কোনো মুদ্রার পক্ষে এর স্থান নেওয়া কঠিন।
ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কেবল অন্য মুদ্রা গ্রহণ করলেই আর্থিক স্বাধীনতা অর্জিত হবে—এমন ধারণার চেয়ে এই লক্ষ্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।












