ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি চ্যাংপেং ঝাও আবারও ফিরেছেন বিলাসবহুল জীবনে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা এই ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রে চার মাসের কারাবাস শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে বসবাস করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমা পাওয়ার পর তাঁর ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন ধনকুবেরের সাফল্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থপাচার প্রতিরোধ, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা এবং স্বার্থের সংঘাত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
৪৯ বছর বয়সী চ্যাংপেং ঝাও ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ায় ‘সিজেড’ নামে পরিচিত। তাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ১১৪ বিলিয়ন ডলার। আবুধাবিতে তাঁর রয়েছে নয় শয়নকক্ষের একটি বিলাসবহুল বাড়ি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী, রাঁধুনি ও ইয়ট। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন তিনি। বিভিন্ন দেশের সরকারকে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ন্ত্রণের নীতি নিয়ে পরামর্শও দিচ্ছেন।
অথচ কয়েক বছর আগেও তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর গুরুতর উদ্বেগ ছিল। মার্কিন তদন্তে উঠে আসে, বিন্যান্সের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী অর্থ স্থানান্তর করেছে। অর্থপাচার, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে লেনদেন এবং জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রবাহের মতো বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসে। ঝাও অর্থপাচারবিরোধী আইন লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করেন এবং প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়েন। প্রতিষ্ঠানটিকে ৪৩০ কোটি ডলার জরিমানাও দিতে হয়।
এরপর তাঁকে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার আবুধাবিতে ফিরে যান। বিপুল সম্পদ, ব্যবসায়িক মালিকানা এবং প্রভাবশালী যোগাযোগের নেটওয়ার্ক অক্ষুণ্ন রেখেই তিনি নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেন।
চীন থেকে কানাডা, তারপর ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায়
ঝাওয়ের জন্ম চীনে। ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কানাডায় চলে যান তিনি। মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে প্রযুক্তি খাতে কাজ শুরু করেন। পরে এশিয়ার বিভিন্ন প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে এ খাতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
২০১৩ সালের জুলাইয়ে সাংহাইয়ে এক সহকর্মীর সঙ্গে তাস খেলার সময় প্রথম বিটকয়েনের কথা জানতে পারেন ঝাও। কয়েক মাস বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনার পর বড় ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাংহাইয়ে পরিবারের তিন শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে পাওয়া প্রায় ৯ লাখ ডলার বিটকয়েনে বিনিয়োগ করেন। তখন এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিনিয়োগই তাঁকে ব্যবসায়িক সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিনি বিন্যান্স প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয় এবং পরেও সেই অবস্থান ধরে রাখে।
বিন্যান্সের দ্রুত সাফল্যের পেছনে দুটি কৌশল ছিল। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রচলিত মুদ্রার বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঋণ নিয়ে বড় অঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগও দিয়েছে। এতে বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সম্পদের দামের ওঠানামা থেকে বেশি মুনাফার আশায় বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হন।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির শুরুর ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত শিথিল। প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত গ্রাহকের পরিচয় যাচাই করে অর্থপাচার ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধ ঠেকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিন্যান্সের প্রথম চার বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে মৌলিক পরিচয়ের তথ্যও নিয়মিত নেওয়া হতো না। ফলে পরিচয় যাচাই ছাড়াই লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়। বাজার যত বড় হয়েছে, প্রতিটি লেনদেন থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয়ও তত বেড়েছে। ঝাওয়ের নিজের লেখা স্মৃতিকথা অনুযায়ী, বিন্যান্সের মুনাফা দ্রুত এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
আইন লঙ্ঘনের দায় ও যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত
সাফল্যের পাশাপাশি বিন্যান্সের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কও বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, যথাযথ নজরদারি ও গ্রাহক যাচাইয়ের অভাবে প্রতারক, হ্যাকার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চাওয়া ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ পেয়েছিলেন।
ঝাও পরে দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকে আইন ভাঙার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তাঁর বক্তব্য, অভিজ্ঞতার অভাবে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। তবে আদালতে উপস্থাপিত তথ্য এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। মার্কিন তদন্তের নথিতে দেখা যায়, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগে ঝাও এমন মনোভাব দেখিয়েছিলেন, যার অর্থ আগে কাজ করে পরে অনুমতি চাওয়াই ভালো। যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার বিষয়টি আড়াল করার কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে আইনি নথিতে উল্লেখ আছে।
শেষ পর্যন্ত মার্কিন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার আওতায় ঝাও অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যবহৃত ব্যাংক গোপনীয়তা আইনের একটি বিধান লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করেন। তাঁকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির ওপর আরোপ করা হয় ৪৩০ কোটি ডলারের জরিমানা।
আদালত তাঁকে চার মাসের কারাদণ্ড দেন। বিচারক তাঁর পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও দানশীলতার বিষয়ও বিবেচনায় নিয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি তুলনামূলক কম নিরাপত্তার কারাগারে সাজা ভোগ করেন তিনি। পরে একটি অস্থায়ী আবাসনে স্থানান্তরিত হলেও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতায় শেষ দুই সপ্তাহ তাঁকে স্থানীয় কারাগারে থাকতে হয়। মুক্তির দিন তাঁর মা, বোন ও সহকারী তাঁকে নিতে যান। সেখান থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে তিনি আবুধাবির উদ্দেশে রওনা হন।
কেন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বেছে নিলেন ঝাও
বিন্যান্স প্রতিষ্ঠার আগে ও পরের কয়েক বছর ঝাও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থেকেছেন। ২০১৭ সালে চীন ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিলে বিন্যান্সের কর্মীদের দেশ ছাড়তে হয়। পরে জাপান ও সিঙ্গাপুরে স্থায়ীভাবে ব্যবসা চালানোর পরিকল্পনাও কাজে আসেনি।
২০২১ সালে এক পরিচিত ব্যবসায়ীর পরামর্শে তিনি দুবাই সফরে যান। সেখানে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশটির একজন সরকারি কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে দেখা করে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতির প্রস্তাব দেন। সাধারণত কয়েক সপ্তাহ লাগে এমন প্রক্রিয়ায় তাঁর অনুমোদন হয়ে যায় ১২ ঘণ্টারও কম সময়ে।
ঝাওয়ের মতো ধনকুবেরদের কাছে আমিরাতের আকর্ষণ শুধু বিলাসী জীবন নয়। দেশটিতে ব্যক্তিগত আয়ের ওপর কর নেই, নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী এবং সরকার সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ টানে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এআইয়ের মতো নতুন প্রযুক্তিতেও দেশটি নিজেকে আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়তে চায়। ঝাওয়ের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমিরাতের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাঁর বিরুদ্ধে মার্কিন তদন্ত যখন জোরদার হচ্ছিল, তখন সেখানে বসবাস ও নাগরিকত্বের সুযোগ তাঁর আইনি অবস্থান নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
২০২২ সালের শেষ দিকে বা ২০২৩ সালের শুরুতে দেশটির রাজপরিবারের এক সদস্য রাতের খাবারের সময় তাঁকে নাগরিকত্বের প্রস্তাব দেন। কাগজপত্র জমা দেওয়ার কয়েক মাস পর তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে দেশটির এই আতিথেয়তা সবার জন্য সমান নয়। আমিরাতের শাসকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নজরদারি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং বিদেশি শ্রমিকদের শোষণের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ঝাওয়ের মতো ধনকুবেরের জন্য দেশটি হয়ে উঠেছে ব্যবসা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সুবিধাজনক কেন্দ্র। দুবাইয়ে কয়েক বছর থাকার পর তিনি আবুধাবিতে চলে যান। এতে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রের আরও কাছে থাকার সুযোগ পান তিনি।
ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়াল নামে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগ চালু করেন। স্টিভ উইটকফের পরিবারও এই ব্যবসায় যুক্ত। পরে উইটকফ ট্রাম্প প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূতের দায়িত্ব পান।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুবাইয়ে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্মেলনে ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্পের সঙ্গে ঝাওয়ের পরিচয় হয়। তখন এটি আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনার অংশ ছিল না। কিন্তু পরে দুই পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ মিলে যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত তখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এআই ও আধুনিক প্রযুক্তির কেন্দ্র হওয়ার চেষ্টা করছিল। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি দেশটির প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীর সদস্য শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা সার্বভৌম সম্পদ ও বিনিয়োগ তহবিলের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
শেখ তাহনুনের নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এমজিএক্স এআই খাতে বিনিয়োগ করে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি বিন্যান্সে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে রাজি হয়। সংশ্লিষ্ট একজনের বরাতে জানা যায়, ওই চুক্তিতে বিন্যান্সের মূল্যায়ন ধরা হয়েছিল ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ঝাও চেয়েছিলেন লেনদেনটি বিটকয়েনে হোক। তবে দামের বড় ওঠানামার কারণে আমিরাতের বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা স্টেবলকয়েন ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বেছে নেন ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়ালের তৈরি ইউএসডি১ নামের স্টেবলকয়েন।
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কারণ ইউএসডি১ তখন একেবারে নতুন। এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের মতো দীর্ঘ রেকর্ড ছিল না। এর আগে খবর বেরিয়েছিল, বিন্যান্সই এমজিএক্সকে এই মুদ্রায় অর্থ দিতে বলেছিল। ঝাওয়ের দাবি, মুদ্রাটি বেছে নিয়েছিল এমজিএক্স নিজেই।
এদিকে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়ালে আমিরাত-সমর্থিত একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশ মালিকানা ছিল। শেখ তাহনুন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদেও যুক্ত হন। একই সময়ে এআইয়ের জন্য উন্নত কম্পিউটার চিপ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিল আমিরাত। আর বিন্যান্সও ২০২৩ সালের সমঝোতায় আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করাতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে চাইছিল। এই প্রেক্ষাপটে দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও ইউএসডি১ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বিতর্ক উসকে দেয়।
‘স্টেবলকয়েন দুর্নীতি’ নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এই লেনদেনকে ‘স্টেবলকয়েন দুর্নীতি’ বলে সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য, এত বড় লেনদেনে নতুন মুদ্রাটি ব্যবহার করায় ট্রাম্প ও উইটকফ পরিবারের প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল সুবিধা পেয়েছে।
স্টেবলকয়েনের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল হলো গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ অর্থ নিয়ে তার বিপরীতে ডিজিটাল মুদ্রা দেওয়া। জমা হওয়া অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে আয় করা হয়। এমজিএক্সের দুই বিলিয়ন ডলারের লেনদেনের ফলে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়াল দ্রুত বিশ্বের বড় স্টেবলকয়েন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এই ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা বলে সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, এমন লেনদেনের পরিসর ও মাত্রা নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রশ্ন তোলে।
ঝাও অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি ইউএসডি১ নিজের কাছে রাখেননি, বরং তা দিয়ে বিটকয়েন ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করেছেন। ট্রাম্প পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা চালাচ্ছেন আর পরিবারের প্রধান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন, এতে বেআইনি কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুই বিলিয়ন ডলারের লেনদেনের দুই সপ্তাহ পর হোয়াইট হাউস উন্নত কম্পিউটার চিপে আমিরাতের প্রবেশাধিকার দিতে রাজি হয়। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একাংশ এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। এসব ঘটনা সরাসরি কোনো অনিয়ম প্রমাণ করে না। তবে একই সময়ে বিনিয়োগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রযুক্তি রপ্তানির অনুমতি ও আইনি সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে।
ট্রাম্পের ক্ষমা নিয়ে বিতর্ক
ঝাওয়ের আইনি অবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করেন। সিদ্ধান্তটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসার সঙ্গে ঝাও ও বিন্যান্সের সম্পর্ক এই ক্ষমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঝাওয়ের আইনি দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকেই ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এ জন্য ক্ষমা ও দণ্ড মওকুফ নিয়ে কাজ করা একজন আইনজীবীর সহায়তাও নেওয়া হয়। বিন্যান্স একটি তদবির প্রতিষ্ঠানের পেছনে ২১ লাখ ডলার খরচ করেছিল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের একজন ব্যক্তিগতভাবে ঝাওয়ের ক্ষমার পক্ষে মত দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ওই ব্যক্তি ক্ষমা প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা রাখেননি।
এই ক্ষমা বিন্যান্সের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আইনি সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে কার্যক্রম চালানোর অনুমতিপত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ক্ষমার ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন সুযোগ পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ক্ষমার পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল কি না, সেই বিতর্ক এখনো চলছে। এমন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আরও প্রমাণ ও আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।
‘সাধারণ মানুষ’ হওয়ার দাবি, বাস্তবে ক্ষমতার কাছাকাছি জীবন
ঝাও প্রায়ই নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। আবুধাবিতে একদিন নিজেই একটি নিশান এসইউভি চালিয়ে শহর ঘুরিয়ে দেখাতে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনযাত্রা সাধারণ মানুষ থেকে অনেক দূরের। বিলাসবহুল বাড়ি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নিজস্ব উড়োজাহাজ এবং বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী ও শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাঁকে ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও আলোচনার বিষয়। আবুধাবির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকে যাওয়ার পথে ঝাও গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্রে অনেক বিতর্কের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নষ্ট হয়, আর একজন সদয় একনায়ক থাকলে সিদ্ধান্ত অনেক দ্রুত হতে পারে। আমিরাতের নেতৃত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি বদলাতে চাইছে। অন্যদিকে দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শ্রমিক অধিকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
এ বছরের শুরুর দিকে ইরান থেকে আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সময় ঝাওয়ের আবুধাবির বাড়ির জানালা কেঁপে ওঠে। বাইরে গিয়ে তিনি আকাশে ধোঁয়ার রেখা দেখতে পান। তবু আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও তিনি দ্রুত কাজে ফিরে যান।
ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের জন্য কী বার্তা
চ্যাংপেং ঝাওয়ের উত্থান ও প্রত্যাবর্তন ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের সামনে একটি বড় প্রশ্ন হাজির করেছে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের সুযোগ দিতে গিয়ে আর্থিক অপরাধ ঠেকানোর নিয়ম কতটা কঠোর হওয়া উচিত? বিন্যান্সের শুরুর সাফল্যের একটি কারণ ছিল সহজ লেনদেন ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ। কিন্তু পরিচয় যাচাই ও নজরদারির দুর্বলতাই পরে প্রতিষ্ঠানটিকে আইনি সংকটে ফেলে।
ক্ষমা চ্যাংপেং ঝাওয়ের ব্যক্তিগত জীবনে নতুন অধ্যায় খুলেছে। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠানের অতীত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইনি সমঝোতা এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লেনদেন নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। আমিরাতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ার আকাঙ্ক্ষা আর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা তাই বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির নিয়ন্ত্রণ আর রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












