ভারতে উৎসবের মৌসুম মানেই নানা ধরনের মিষ্টি, পারিবারিক আয়োজন ও উপহার বিনিময়। গণেশ চতুর্থী থেকে শুরু করে নবরাত্রি, দশেরা এবং দীপাবলি—প্রতিটি উৎসবেই খাবারের তালিকায় চিনির তৈরি মিষ্টির বিশেষ জায়গা রয়েছে। কিন্তু এ বছর চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎসবের আনন্দে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বাজারে মজুত ধরে রাখার প্রবণতা মিলিয়ে দেশটিতে চিনির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মুম্বাইয়ে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনির দাম প্রায় ৫৩ রুপি। জুন মাসে যেখানে একই পরিমাণ চিনির দাম ছিল ৪৬ রুপি, সেখানে কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। তবে উৎসবের আগে দাম আরও বেশি বেড়েছিল। আগস্টের শেষ দিকে ভারতের কয়েকটি শহরে প্রতি কেজি চিনির দাম ৭০ রুপিতে পৌঁছে যায়। মাত্র দুই মাসের মধ্যে কোনো কোনো বাজারে দাম বৃদ্ধির হার ছিল ৫০ শতাংশেরও বেশি।
ভারতে উৎসবের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক বহু পুরোনো। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত গণেশ চতুর্থীতে ঘরে ঘরে হাতির মাথাবিশিষ্ট দেবতা গণেশের প্রতিমা স্থাপন করেন ভক্তরা। সাধারণত কয়েক দিন পর প্রতিমা সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় গণেশের প্রিয় খাবার হিসেবে নারকেল ও গুড় দিয়ে তৈরি একধরনের পিঠাও খাওয়া হয়।
এরপর আসে নবরাত্রি। দেবী দুর্গার নয়টি রূপের সম্মানে টানা নয় রাত ধরে চলে নাচ, উপবাস ও নানা ধর্মীয় আয়োজন। উৎসবের অষ্টম দিনে দুর্গার বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে ছোট মেয়েদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের সুজি, ঘি ও চিনি দিয়ে তৈরি হালুয়া খাওয়ানো হয়।
দশেরায় উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাবণের বিরুদ্ধে রামচন্দ্রের বিজয় উদ্যাপন করা হয়। এ উপলক্ষে লাখো মানুষের কাছে জনপ্রিয় জিলাপির চাহিদা বেড়ে যায়। এরপর আসে দীপাবলি বা আলোর উৎসব। এ সময় পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উপহার হিসেবে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির বাক্স বিনিময় করা হয়। ফলে উৎসবের মৌসুমে চিনির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এবার সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যবৃদ্ধি।
উৎপাদন কমায় বেড়েছে চাপ
চিনির দাম বাড়ার পেছনে প্রাকৃতিক কারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভারতের অন্যতম প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্রে গত বছরের অক্টোবরে মৌসুমের বাইরের বৃষ্টিতে আখের খেত জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে আখ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে উত্তর ভারতের আখ উৎপাদন অঞ্চলের বিভিন্ন খেতে ছড়িয়ে পড়ে ছত্রাকজনিত রোগ রেড রট। এই রোগ আখের বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত করতে পারে। এসব কারণে চলতি মৌসুমে চিনির উৎপাদন নিয়ে পূর্বাভাস কমানো হয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি।
উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর বাজারে চিনির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে দামেও। তবে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগকেই দায়ী করছেন না বিশ্লেষকেরা। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন।
রপ্তানির অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন
চিনির উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পরও ভারত সরকার ৮ লাখ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পরে সরকার সব ধরনের চিনি রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
চিনির দাম বৃদ্ধির আলোচনায় আখ থেকে ইথানল উৎপাদন এবং পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর সরকারি নীতিও উঠে এসেছে। এই নীতির উদ্দেশ্য হলো জ্বালানিতে ইথানলের ব্যবহার বাড়ানো এবং আখভিত্তিক উৎপাদনের বিকল্প ব্যবহার নিশ্চিত করা। সমালোচকদের দাবি, আখ থেকে ইথানল তৈরি করায় চিনির সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
তবে চলতি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে এই যুক্তিকে যথেষ্ট মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের মোট আখের প্রায় ৯ শতাংশ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে এই হার ছিল ১২ শতাংশ। অর্থাৎ আগের তুলনায় ইথানল উৎপাদনে আখের ব্যবহার কমেছে। তাই শুধু এই নীতিকে চিনির দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
মজুত ধরে রাখায় বেড়েছে বাজারের অস্থিরতা
উৎপাদন কমার আশঙ্কা বাজারে নতুন ধরনের হিসাব তৈরি করে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্জয় কুমারের মতে, চিনির দাম বৃদ্ধির পেছনে ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চিনিকলগুলোর ধারণা হয়েছিল, ভবিষ্যতে চিনির দাম বাড়লে তাদের হাতে থাকা মজুতের মূল্যও বাড়বে। ফলে কিছু চিনিকল দ্রুত বাজারে চিনি ছাড়ার পরিবর্তে মজুত ধরে রাখতে শুরু করে। এতে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ পড়ে এবং দাম বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চিনিকলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। আগে মাসে একবার নির্ধারিত পরিমাণ চিনি বাজারে ছাড়ার নিয়ম থাকলেও পরে প্রতি ১৫ দিনে সেই পরিমাণ চিনি বিক্রির বাধ্যবাধকতা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া কিছু পরিমাণ চিনি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়। সাধারণত বিদেশ থেকে চিনি আমদানিতে ১০০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যা বিদেশি উৎপাদকদের জন্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ কঠিন করে তোলে। শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরও বিদেশি চিনি খুব বেশি পরিমাণে ভারতের বাজারে আসেনি। তবে আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। সঞ্জয় কুমারের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাজারের মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে সাহায্য করেছে।
কৃষককে সুরক্ষা দিতে গিয়ে জটিলতা
ভারতের চিনির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষক, চিনিকল ও ভোক্তাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চলছে। সরকার আখচাষিদের জন্য ‘ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য’ নির্ধারণ করে দেয়। চলতি মাস থেকে শুরু হওয়া মৌসুমে প্রতি ১০০ কেজি আখের জন্য এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬৫ রুপি। ২০১৮ সালের তুলনায় তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
সরকার নির্ধারিত এই মূল্য কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু উৎপাদন বেশি হলে চিনিকলগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ চিনি জমে যায়। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে সরকার রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রপ্তানিতে ভর্তুকিও দিয়েছে।
এর ফলে ২০২১ সালের মধ্যে ভারত ব্রাজিলের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ভারতের চিনি রপ্তানিতে দেওয়া ভর্তুকির বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পর সরকার উদ্বৃত্ত আখ ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে ইথানল উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
একটি সমস্যার সমাধানে নেওয়া পদক্ষেপ অন্য সমস্যার জন্ম দিয়েছে—ভারতের চিনির বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ। কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, চিনিকলগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের সাশ্রয়ী মূল্যে চিনি সরবরাহ করা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বিশ্বের আবহাওয়ার পরিবর্তন ভারতের চিনির বাজারের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এল নিনো নামের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া আগামী বছর ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল করে দিতে পারে। একই সময়ে ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডেও চিনির উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের প্রধান চিনি উৎপাদনকারী দেশগুলোর উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হতে পারে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হওয়া ভবিষ্যৎ সরবরাহভিত্তিক চিনির চুক্তির দাম চলতি বছরে ২৪ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়লে ভারত আমদানি বাড়িয়েও দেশের ভোক্তাদের পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারবে না।
কারণ, আমদানি করা চিনির দামও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। বিশ্ববাজারে দাম বেশি থাকলে বিদেশ থেকে চিনি আনার খরচ বাড়বে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়লেও ভোক্তাদের জন্য দাম কমানো কঠিন হতে পারে।
ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে আখচাষিদের স্বার্থ রক্ষায় এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে কৃষকের উৎপাদিত আখের জন্য নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থার মধ্যেই উৎপাদন ঘাটতি, মজুত ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ একসঙ্গে দেখা দিচ্ছে। একদিকে কৃষকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা, অন্যদিকে উৎসবের মৌসুমে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চিনির দাম রাখা—দুই লক্ষ্য পূরণ করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বছরের উৎসবে ভারতীয়দের মিষ্টি খাওয়ার আনন্দ তাই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছে। আর আগামী বছর উৎপাদন ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে চিনির বাজারে এই চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।












