চীনের নানা শহরে এখন এক অদ্ভুত কাজের চল দেখা যাচ্ছে। মানুষ মাথায় ভিআর হেডসেট আর শরীরে যান্ত্রিক কাঠামো পরে কাপড় ভাঁজ করছেন, টেবিল মুছছেন। এর জন্য তাঁরা টাকাও পাচ্ছেন। তাঁদের প্রতিটি নড়াচড়া রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। সেই তথ্য দিয়ে শেখানো হচ্ছে মানুষের মতো দেখতে রোবটকে। দেশজুড়ে এমন তথ্য সংগ্রহ কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়ছে।
দৃশ্যটা অদ্ভুত লাগলেও এর ভেতরে একটা বড় প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে। এআই প্রতিযোগিতায় কে জিতবে? আর যে জিতবে, আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থাও সম্ভবত সে-ই গড়বে। পাকিস্তানের সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদ আসাদ বেইগ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সেরা মডেলের তালিকায় নয়, কারখানার মেঝে আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, এআই দৌড়ে আমেরিকাকে জিততেই হবে। তাঁর প্রশাসন একে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মহাকাশ প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করছে। তবে তাঁর বিজ্ঞান উপদেষ্টা মাইকেল ক্রাটসিওস নিজেই মেনে নিয়েছেন, এই দৌড়ের কোনো শেষ রেখা নেই। চাঁদে মানুষ নামানোর মতো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে এখানে কেউ বিজয়ী ঘোষিত হবে না।

প্রচলিত মাপকাঠিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে। স্ট্যানফোর্ডের ২০২৬ সালের এআই সূচক বলছে, ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য এআই মডেল এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫৯টি, চীন থেকে ৩৫টি। মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগ চীনের প্রায় ২৩ গুণ। যদিও চীনের সরকারি অর্থায়ন এই হিসাবে পুরোটা ধরা পড়ে না। আর মডেলের দক্ষতার ফারাক কার্যত মুছে গেছে। ২০২৬ সালের মার্চে শীর্ষ মার্কিন মডেল চীনের সেরা মডেলের চেয়ে মাত্র ২.৭ শতাংশ এগিয়ে ছিল।
আসল লড়াই কারখানায়
লেখকের মতে, শুধু সেরা মডেল দিয়ে এই লড়াইয়ের বিচার হবে না। চীন এগিয়ে যেতে পারে এআইকে বাস্তব অর্থনীতিতে বসিয়ে দিয়ে। এ বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশন একটি চক্রের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। সস্তা ও উন্মুক্ত মডেল কারখানা, পরিবহন আর রোবটে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখান থেকে আসছে বাস্তব জগতের তথ্য। সেই তথ্যে মডেল আরও ভালো হচ্ছে। এই চক্র মার্কিন বন্ধ মডেলগুলোকে ছাপিয়ে যেতে পারে, এমনকি পরীক্ষার নম্বরে মার্কিন মডেল এগিয়ে থাকলেও।
চীন ২০২০ সালেই তথ্যকে উৎপাদনের উপাদান হিসেবে ঘোষণা করেছে। জমি, শ্রম আর পুঁজির মতো তথ্যেরও দাম আছে, এই ধারণা থেকেই নীতি সাজানো হয়েছে। কারখানার শ্রমিকেরা নিজেদের ক্যামেরা ও সেন্সরের তথ্য দিয়ে টাকা পান। অনেকে ঘরের কাজ করে রোবটকে শেখাচ্ছেন এবং তার জন্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এআই উত্থানের গল্পটা আলাদা। সেখানে এআই বেড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ইন্টারনেটে জমা হওয়া লেখা, ছবি আর ব্যবহারকারীর আচরণের তথ্যের ওপর। দেশটির ফেডারেল ট্রেড কমিশন বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক নজরদারির অভিযোগ তুলেছে। ব্যবহারকারীর হাতে নিজের তথ্যের নিয়ন্ত্রণ খুব কম। লেখক অবশ্য পরিষ্কার করে বলেছেন, চীনে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ভালো, এমন নয়। তাঁর কথা হলো, চীন তথ্য তৈরি করে, তার দাম ঠিক করে, তারপর আবার শিল্পে ফিরিয়ে দেয়। এই ব্যবস্থাই তাকে বড় সুবিধা দিতে পারে।
রোবটের হিসাবও চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালের মধ্যে চীনে ২০ লাখের বেশি শিল্প রোবট চালু ছিল। ২০২৫ সালে বসানো হয়েছে আরও ৩ লাখ ৫৪ হাজার। আন্তর্জাতিক রোবটিক্স ফেডারেশনের হিসাবে, সেই বছর বিশ্বে নতুন বসানো শিল্প রোবটের ৫৯ শতাংশই চীনে। কারখানা রোবট বানায়, রোবট তথ্য দেয়, তথ্য এআইকে উন্নত করে, এআই আবার কারখানাকে উন্নত করে। লেখকের চোখে এটাই চীনের আসল শক্তি।
বিদ্যুৎই হবে নির্ধারক

এআই চালাতে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৫০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে। যে দেশ সবচেয়ে দ্রুত সস্তা ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়াতে পারবে, সে-ই এগিয়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই দশকে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই আসবে ডেটা সেন্টার থেকে। এসব ডেটা সেন্টারের ৪০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। গ্রিড সংযোগে দেরি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে। জ্বালানি সংস্থা বলছে, নির্ভরযোগ্য সরবরাহের জন্য চাহিদার চেয়ে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ বেশি সক্ষমতা রাখতে হয়। অথচ টারবাইনের ঘাটতি এই কাজ ধীর করে দিতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্বের সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় ৮৫ শতাংশ আর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ চীনের হাতে। শুধু ২০২৫ সালেই দেশটি প্রায় ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করেছে। তবে লেখক চীনের মডেলকে আদর্শ হিসেবে দেখাতে চান না। চীনের ডেটা সেন্টারের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ এখনো কয়লা থেকে আসে। তবু নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন আর মজুতের যন্ত্রপাতির বড় অংশ চীন নিজেই বানায়।
চীনের দুর্বলতাও আছে। চিপ তৈরির কিছু ধাপে দেশটি এখনো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। উন্নত মেমোরির ওপর নিষেধাজ্ঞায় দেশীয় চিপের খরচ বাড়ছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়ার চিপের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। গবেষণা, এনভিডিয়ার চিপ ব্যবস্থা আর পুঁজিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। প্রতিযোগিতা ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়েও। যুক্তরাষ্ট্র হার্ডওয়্যার, মডেল, সফটওয়্যার আর মানদণ্ড মিলিয়ে পুরো প্রযুক্তি প্যাকেজ রপ্তানি করতে চায়। চীন ছড়াচ্ছে উন্মুক্ত মডেল আর নিজস্ব আন্তর্জাতিক কাঠামো। সব মিলিয়ে লেখকের পাল্লা চীনের দিকেই ঝুঁকে আছে, কারণ চীন এআইকে শিল্পশক্তি আর উৎপাদনশীলতায় রূপ দিচ্ছে।
ছোট দেশের জন্য শিক্ষা
লেখক এরপর নিজের দেশ পাকিস্তানের দিকে তাকিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপে পড়া চলবে না। উন্নত চিপ, বড় মডেল বা বিশাল ডেটা সেন্টারে প্রতিযোগিতা করার মতো শিল্পভিত্তি পাকিস্তানের নেই। তাই সীমিত সম্পদ সেখানেই খরচ করা উচিত, যেখানে ফল সবচেয়ে বেশি। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং সক্ষমতা, সংবেদনশীল তথ্য দেশে রাখা, দক্ষ জনবল, স্থানীয় ডেটা আর অধিকার রক্ষার নিয়ম, এগুলোই অগ্রাধিকার। যেখানে কাজে লাগে, সেখানে বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। আর যেখানে নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করে, সেখানে নিজের সক্ষমতা গড়তে হবে।

তাঁর মূল কথা, দৌড়ে জেতার দরকার নেই, দরকার এআই থেকে উপকার পাওয়া। কৃষকের পানি বাঁচানো, শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীর দুর্বলতা ধরা পড়া, ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সরকারি দপ্তরে অপচয় কমানো, এসবই আসল কাজ। “এআই হাব” হওয়ার ঘোষণার চেয়ে এগুলোর দাম অনেক বেশি। চীনের শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি তখনই শক্তি হয়, যখন তা উৎপাদন বাড়ায়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অন্যের বানানো ব্যবস্থার শুধু বাজার হয়ে থাকা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানের জন্য লেখা এই পরামর্শ বাংলাদেশের জন্যও কম প্রাসঙ্গিক নয়। বাংলাদেশও এখন জাতীয় এআই নীতির খসড়া তৈরি করছে। গত জুলাইয়ে চীনের সাংহাইয়ে বিশ্ব এআই সম্মেলনের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ কথা জানান। তিনি বলেন, এআইয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায় আর অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে। সরকার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি কাজে এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা আর দেশজুড়ে এআই উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ার কথাও বলছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর আর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এআইতে সমান সুযোগের দাবিও তুলেছেন মন্ত্রী।
লেখকের দুটি সতর্কতা এখানে বিশেষ করে মনে রাখার মতো। প্রথমটি বিদ্যুৎ। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি করে। ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় সেই চাপ দেশের মানুষ সরাসরি টের পাচ্ছেন। সস্তা ও স্থির বিদ্যুৎ ছাড়া বড় ডেটা সেন্টার বা এআই অবকাঠামোর স্বপ্ন টেকসই হবে না। দ্বিতীয়টি তথ্য। বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষা, কৃষি, স্বাস্থ্য আর সরকারি সেবার তথ্য দেশের মানুষের কাজে লাগাতে না পারলে, বাংলাদেশও কেবল অন্যের তৈরি এআইয়ের ক্রেতা হয়ে থাকবে। বড় ঘোষণার চেয়ে কৃষকের সেচ, শিক্ষার্থীর পড়া আর সরকারি দপ্তরের সেবায় ছোট ছোট কার্যকর ব্যবহারই হয়তো বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে বড় লাভ।
আসাদ বেইগ: সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ এবং মিডিয়া ম্যাটার্স ফর ডেমোক্রেসির প্রতিষ্ঠাতা। লেখাটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কলাম অবলম্বনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অংশটি সারাক্ষণের সংযোজন।












