এক রোববার হঠাৎ “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি” ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘোষণায় অবাক হয় কিয়েভ। মস্কো চুপ থাকে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া মানলে ইউক্রেনও মানবে। পরদিনই তিনি জানান, ঘোষণার পর ইউক্রেনের ছয়টি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। খবর অনুযায়ী, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, ইউক্রেন কোনো বিরতির যোগ্য নয়।
জ্বালানি যুদ্ধবিরতির অর্থ, দুই পক্ষ একে অন্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার আর গ্যাস স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখবে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে দুই দেশই প্রতিপক্ষের জ্বালানি অবকাঠামোকে বড় লক্ষ্য বানিয়েছে। ইউক্রেনের মানুষ শীতের আগে বিদ্যুৎ নিয়ে শঙ্কায়। রাশিয়ার জন্য তেল শোধনাগার মানে রপ্তানি আয়। তাই এমন বিরতি কাগজে-কলমে দুই পক্ষের জন্যই স্বস্তির হওয়ার কথা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির কলাম লেখক মাহির আলীর প্রশ্ন, এই যুদ্ধবিরতি আসলে কার জন্য? ইউক্রেনের মানুষের জন্য, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল পাম্পে দাঁড়ানো ভোটারের জন্য? তাঁর বিশ্লেষণে উত্তরটা দ্বিতীয়টির দিকেই ঝুঁকে আছে।
ডিজেলের দাম আর ভোটের অঙ্ক

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেশির ভাগ বিশ্লেষক এর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে দায়ী করছেন। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ওয়াশিংটন যে দাবি করছে, লেখক তাতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে আফগানিস্তানে সোভিয়েত অভিযানের পর স্নায়ুযুদ্ধের কট্টরপন্থীরাও এই প্রণালি দখলের কথা ভেবেছিলেন। সেটা তখন ভাবনাতেই থেকে গিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই মস্কোর সঙ্গে ট্রাম্পের ডিজেল চুক্তি। এতে রুশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্প্রতি দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা হয়েছে। লেখকের মতে, এর আসল লক্ষ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সুবিধা দেওয়া। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষই জিতলে ট্রাম্পকে তিরস্কার, এমনকি তৃতীয়বার অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে। একই হিসাব তিনি দেখছেন ইসরায়েলেও। এ মাসের নির্বাচনে জোট হারলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য আইনি বিপদ অপেক্ষা করছে বলে লেখক মনে করেন।
ডিজেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়। ট্রাক, কৃষিযন্ত্র, জাহাজ, কারখানার জেনারেটর, সবখানেই ডিজেল। তাই এর দাম অর্থনীতির প্রায় সব পণ্যের দামে ঢুকে যায়। লেখক বলছেন, জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। এমনকি তাঁর নিজের “মাগা” সমর্থকেরাও হতাশ, কারণ তাঁর ক্ষমতায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি আবারও জেলেনস্কির বদলে আরও অনুগত কাউকে চেয়েছেন। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সরানোর কথা একবারও বলেননি। একদিনে যুদ্ধ থামানোর ২০২৪ সালের প্রতিশ্রুতি এখন পুরোনো ইতিহাস। ট্রাম্প এখনো বলেন, ২০২২ সালে তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই যুদ্ধ শুরুই হতো না। লেখক মনে করেন, কথাটা পুরোপুরি অবাস্তব নয়। কারণ বাইডেন প্রশাসন যে যুদ্ধ আসছে বলে জানত, তা ঠেকাতে পারেনি।
তবে দেশের ভেতরের সব সমস্যার জন্য “ঘুমকাতুরে জো বাইডেনকে” দায়ী করার কৌশল এখন আর কেউ গুরুত্ব দিয়ে নেয় না, এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকেরাও না। আবার লেখক সতর্ক করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা জিতলেই ইউক্রেন সংকট মিটে যাবে, এমন ভাবারও কারণ নেই। বরং ন্যাটোর কট্টরপন্থী অংশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মিলে গেলে, বিশেষ করে ইউরোপে, ফল ভয়াবহ হতে পারে।
ইউরোপের অস্ত্র প্রতিযোগিতা
ইউরোপ দ্রুত অস্ত্র বাড়াচ্ছে। কিছুটা ট্রাম্পকে খুশি রাখতে, তবে মূলত রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে। কেউ কেউ সেই সংঘাতকে অনিবার্য ভাবছেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড আর ফিনল্যান্ড এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগ্রাসী। লেখক লক্ষ করেছেন, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা আর বামপন্থীদের বড় অংশ রাশিয়ার প্রতি এই বৈরিতার শরিক নয়। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় বিপদ আসছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইইউ আর ন্যাটোর মধ্যপন্থী নেতাদের কাছ থেকে। ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে গিয়ে তাঁরাও যুদ্ধংদেহী পথে হাঁটছেন।

পুতিনের ভুল হিসাবের নজির আছে। রাশিয়া এমন কিছু করে বসতে পারে, যা বড় যুদ্ধ ডেকে আনবে। ঠিক যেটা ন্যাটোর কট্টরপন্থীরা চায়। লেখক দুই পক্ষের সংযম আশা করছেন। তবে ট্রাম্প যে ডিজেল স্বস্তি চাইছেন, তা আসবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ আছে। ইউক্রেনে নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট এলেও তিনি পুতিনের দাবি মেনে আত্মসমর্পণ করবেন কি না, সেটাও প্রশ্ন। ইসরায়েলের নির্বাচনের পরও দেশটির আগ্রাসী নীতি চলবে বলে তাঁর ধারণা। একে তিনি গণহত্যামূলক বলে অভিহিত করেছেন।
লেখকের শেষ কথা, কিছু ব্যতিক্রম বাদে বিশ্বজুড়ে নির্বাচন এখন খুব কমই বদল আনে। ভুয়া তথ্যমুক্ত গণতন্ত্র হয়তো অতীতের বিষয়, তবু তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ফিলিস্তিন থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত লোক দেখানো যুদ্ধবিরতি এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের দিকে যাত্রা থামাতে পারবে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
ওয়াশিংটনের পেট্রল পাম্পের হিসাব ঢাকার বাজার থেকে খুব দূরে নয়। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। এখন তা ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর ধাক্কা সামলাতে না পেরে সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন আর কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে হয়েছে ১৩৫ টাকা। অক্টোবরের জন্য এই দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকার আরেকটি যুক্তিও দিয়েছে। প্রতিবেশী বেশির ভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম এখনো কম। দামের এই ফারাক বেশি হলে সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের চাপ, ভর্তুকির বোঝা আর পাচারের ভয়, তিন দিক থেকেই চাপে আছে জ্বালানি খাত। পরিবহনমালিক, কৃষক আর কারখানার মালিকেরা সেই চাপ ভাগ করে নিচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত যা পৌঁছায় সাধারণ ক্রেতার কাছে।
দাম বাড়ার পরও চাপ কমেনি। মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিশ্ববাজারের পুরো দাম ভোক্তার ঘাড়ে চাপানো হয়নি। এলএনজিতে ভর্তুকির খরচও বাড়ছে। মানুষকে দামের ধাক্কা থেকে আড়াল করতে সরকারকে প্রতি মাসে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ব্যাংক খাত সংস্কার আর তরুণদের দক্ষ করে তোলার মতো বড় পরিকল্পনাগুলোও এই চাপের মুখে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও ডিজেলের দাম মানে কৃষকের সেচ, পণ্য পরিবহন আর বাজারের সবজির দাম। তাই হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমবে কি না, রাশিয়ার তেল বাজারে ফিরবে কি না, আর বড় শক্তিগুলোর “যুদ্ধবিরতি” আসল না লোক দেখানো, এসব প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের মানুষের পকেটেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। বড় শক্তিগুলোর ভোটের হিসাব আর যুদ্ধের কৌশল যেভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ঘুরিয়ে দিচ্ছে, তার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের সাধারণ মানুষের গায়েই। তাই দূরের যুদ্ধ আর বিদেশি নির্বাচনের খবর আসলে আমাদের ঘরের বাজারেরও খবর। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে নজর রাখা এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
মাহির আলী: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক কলাম লেখক। লেখাটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কলাম অবলম্বনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অংশটি সারাক্ষণের সংযোজন।












