নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে শুক্রবার রাত সোয়া নয়টায় দুর্গাপুর থানায় মামলা করেন তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। তবে শনিবার সকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় আলিফকে গুলি করা হয়। সাংবাদিক আলিফ হত্যা নিয়ে দেশজুড়ে সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ মামলা দায়েরের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মামলা হওয়ার আগে থেকেই এসআরবি, পিবিআই, স্থানীয় পুলিশ আর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। জেলা পুলিশ সুপার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (অপরাধ) নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল গঠন করেছেন। ওসির ভাষায়, পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। শুক্রবার বিকেলে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ধিতপুর শুনই গ্রামে জানাজা শেষে আলিফকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দুর্গাপুর নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা। পাহাড়ি নদী আর সাদামাটির এলাকা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে বালু আর পাথর উত্তোলন নিয়ে বিরোধের খবর প্রায়ই আসে। স্থানীয় সাংবাদিকেরা এসব বিষয়ে লিখলে চাপের মুখে পড়েন বলে অভিযোগ বহু পুরোনো।
আলিফের ছোট ভাই সাদেকুর রহমান ফকির অভিযোগ করেছেন, সংবাদ প্রকাশের কারণে তাঁর ভাই আগেও হামলা আর হুমকির শিকার হয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, খবর লেখার জন্যই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে। খুনিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা। স্থানীয় সাংবাদিকেরাও মানববন্ধন আর প্রতিবাদের ঘোষণা দিয়েছেন। আগের হুমকির বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ ছিল কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মফস্বলের সাংবাদিকেরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে কাজ করেন। তাঁরা স্থানীয় প্রভাবশালী, মাদক কারবারি বা অবৈধ বালু ও পাথর ব্যবসার খবর লেখেন। দুর্গাপুর সীমান্তবর্তী এলাকা। সেখানে চোরাচালান আর বালুমহাল নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। এ ধরনের এলাকায় খবর প্রকাশের পর প্রতিশোধের ঝুঁকি থাকে। অথচ তাঁদের নিরাপত্তা, বেতন বা আইনি সহায়তা প্রায়ই থাকে না। সাংবাদিক আলিফ হত্যা সেই অনিরাপদ বাস্তবতাকেই আবার সামনে আনল। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী আগের হামলা আর হুমকির ঘটনাগুলো এই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। কে বা কারা হুমকি দিয়েছিল, সে সময় থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। দোকানের ভেতরে বসে থাকা অবস্থায় গুলি করে হত্যা পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত দেয়। সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় সব আসামি অজ্ঞাতনামা, তাই তদন্ত সংস্থার দক্ষতার ওপরই সব নির্ভর করছে। মামলার বাদী তাঁর স্ত্রী। তাই পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি। গ্রেপ্তারে দেরি হলে আলামত নষ্ট হওয়া আর খুনিদের পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সাংবাদিক হত্যার বিচারে দেশের রেকর্ড ভালো নয়। সাগর রুনি হত্যার বিচার এক যুগের বেশি সময়েও শেষ হয়নি। তাই এই মামলায় দ্রুত গ্রেপ্তার আর স্বচ্ছ তদন্ত হলে সেটাই হবে সরকারের প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা। সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতি চাই। খুনিরা ধরা না পড়লে মফস্বলের সাংবাদিকতা আরও ভয়ের মধ্যে চলে যাবে।












