নিত্যপণ্যের চড়া দামের মধ্যে এবার বাড়তে শুরু করেছে চালের দাম। গত এক সপ্তাহে ঢাকার বাজারে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে এক থেকে দুই টাকা। মিরপুর-১, মিরপুর-১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর আর কারওয়ান বাজার ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে। নাজিরশাইল ছাড়া প্রায় সব জাতের চালের দামই বেড়েছে। দিনমজুর আর নিম্ন আয়ের পরিবারে চালের দাম বৃদ্ধি সবচেয়ে আগে টের পাওয়া যাচ্ছে।
তেজকুনিপাড়ার মমতাজ বেগম প্রায় ৩০ জনকে দুপুর আর রাতের খাবার সরবরাহ করেন। তাঁর গ্রাহকদের বেশির ভাগই দিনমজুর, যাঁরা বেশি ভাত খান। প্রতিজনের কাছ থেকে নেন ১৫০ টাকা। সাড়ে চার মাস আগে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়েছেন। মমতাজ বলেন, কেজিতে এক টাকা বাড়ায় তাঁর মাসিক খরচ বেড়েছে ৩৬০ টাকা। আবার দাম বাড়ালে গ্রাহক হারানোর ভয় আছে। গ্যাস সিলিন্ডার আর বিদ্যুৎ বিলের চাপে এমনিতেই তাঁর ধার বাড়ছে। চালের দাম আরও বাড়লে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হতে পারে বলে জানান তিনি। শুধু চাল নয়, ডাল, ভোজ্যতেল আর ডিমের দামও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওঠানামা করেছে। অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের আয়ের প্রায় পুরোটাই এখন খাবার আর বাসাভাড়ায় চলে যায়। সঞ্চয় বলে কিছু থাকছে না।
মিরপুর-১১ বাজারের মকবুল রাইস এজেন্সির মালিক কামাল হোসেন বলেন, কয়েক মাস স্থির থাকার পর জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। তার প্রভাবেই চালের দাম উঠছে। তিনি জানান, বছরের এই সময়ে মজুত চাল পুরোনো হয়ে যায়। নতুন ধান বাজারে আসতে আরও অন্তত দুই মাস লাগবে। কারওয়ান বাজারের জনতা রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক সোহরাব হোসেন অবশ্য বলছেন, পরিবহন খরচের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়েছেন। কোনো জেলায় চালের ঘাটতি নেই বলেও জানান তিনি।
চালের দাম বৃদ্ধি এমন সময়ে এল, যখন দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২২ শতাংশে। গরিব পরিবারের আয়ের বড় অংশই যায় খাবারে, আর খাবারের মূল অংশ ভাত। তাই কেজিতে দুই টাকা বাড়াও তাদের কাছে বড় অঙ্ক। শাকসবজির দামও চড়া। বেশির ভাগ সবজি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিকোচ্ছে। মোটা চাল কেনেন মূলত দিনমজুর, রিকশাচালক আর গরিব পরিবার। তাই চালের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি টান পড়ে তাদের সংসারে। একটি পরিবার মাসে ৩০ থেকে ৪০ কেজি চাল কিনলে কেজিতে দুই টাকা বাড়া মানে মাসে ৬০ থেকে ৮০ টাকা বাড়তি খরচ। সেই সঙ্গে সবজি, ডিম আর গ্যাসের দাম যোগ হলে চাপ অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত নতুন আমন ধান উঠলে বাজারে চালের দাম কিছুটা নামে। তার আগ পর্যন্ত সরবরাহ ঠিক রাখা আর কৃত্রিম সংকট ঠেকানোই প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমন ধান ওঠার আগের এই দুই মাস সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খোলাবাজারে চাল বিক্রি, ন্যায্যমূল্যের দোকান আর মজুতদারির ওপর নজরদারি বাড়ালে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকলে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে দেরি করার কারণ নেই। তা না হলে শীতের শুরুতেই নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার আরও টানাটানিতে পড়বে।












