ঢাকার কাঁচাবাজারে বেশির ভাগ সবজির দাম যখন চড়া, তখন কাঁচা পেঁপে বিক্রি হচ্ছে পানির দরে। পাইকারি বাজারে পেঁপের দাম কেজিপ্রতি মাত্র চার থেকে ১০ টাকা। গত বছর এই সময়ে একই পেঁপে বিক্রি হয়েছিল কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এক সপ্তাহ ধরে এই দরপতন চলছে। ক্রেতার জন্য স্বস্তি হলেও পেঁপের দাম কমে যাওয়ায় বড় লোকসানে পড়েছেন কৃষক আর ব্যবসায়ীরা।
কারওয়ান বাজারে ৪৭ বছর ধরে পেঁপের পাইকারি ব্যবসা করছেন শের আলী পাঠান। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার পাঁচ জেলার কৃষকদের তিন কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে ছয় থেকে সাত টাকায় পেঁপে বিক্রি করছেন। সোমবার দাম নেমেছে চার টাকায়। অথচ চুয়াডাঙ্গা বা যশোর থেকে ঢাকায় আনার পরিবহন খরচই কেজিতে চার টাকার বেশি। তিন কোটি টাকার মধ্যে ৫০ লাখও তুলতে পারবেন কি না, সন্দেহ তাঁর। ব্যাংকের ঋণ আর সুদ কীভাবে শোধ করবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষকদের কাছে মৌসুমের আগে উৎপাদন আর চাহিদার পূর্বাভাস পৌঁছালে এমন অতিরিক্ত চাষ এড়ানো যেত।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে তিন টন পেঁপে নিয়ে এসেছিলেন রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, জমির ভাড়া, বীজ আর সার মিলিয়ে কেজিতে উৎপাদন খরচ ১০ থেকে ১২ টাকা। পরিবহন আর শ্রমিক মিলিয়ে আরও তিন টাকা। অর্থাৎ মোট খরচ ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ তাঁকে বিক্রি করতে হয়েছে ছয় থেকে আট টাকায়। প্রতি কেজিতে অর্ধেকের বেশি লোকসান গুনছেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের পরিচালক ড. মো. হযরত আলী বলেন, এ বছর পেঁপের চাষ আর উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। আমদানি করা হাইব্রিড জাতের চাষ অনেক বেড়েছে। কয়েকটি জেলায় নতুন করে বহু জমি পেঁপে চাষে এসেছে। গত বছরের চড়া দাম দেখে কৃষকেরা একসঙ্গে পেঁপে চাষে ঝুঁকেছেন। ফলে বাজারে সরবরাহ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। পাইকারি বাজারে দাম এত কমলেও খুচরা বাজারে ক্রেতা সেই সুবিধা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কৃষক আর ক্রেতার মাঝখানে কয়েক হাত ঘুরে পণ্য পৌঁছায়, প্রতিটি হাতে দাম কিছুটা বাড়ে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর চাইলে সরাসরি কৃষকের বাজার বা মৌসুমি হাট চালু করতে পারে। এতে কৃষক কিছুটা বেশি দাম পেতেন, ক্রেতাও কম দামে কিনতেন। পেঁপে দ্রুত পচনশীল হওয়ায় কৃষকের হাতে অপেক্ষার সুযোগ থাকে না। সংরক্ষণাগারের অভাবে লোকসান মেনে নিয়েই বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের। পেঁপের দাম কমার এই ধাক্কা অনেক কৃষক পরিবারকে ঋণের চাপে ফেলবে।
এই চিত্র বাংলাদেশের কৃষিতে পরিচিত। এক বছর আলু, পরের বছর পেঁয়াজ, এবার পেঁপে। দাম ভালো দেখলেই সবাই এক ফসলে ঝোঁকেন, তারপর দরপতন। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম উৎপাদন পূর্বাভাস, সংরক্ষণ ব্যবস্থা আর প্রক্রিয়াজাত শিল্প থাকলে পেঁপের দাম এতটা পড়ত না। পেঁপে থেকে জ্যাম, আচার বা প্যাপেইন তৈরির কারখানা গড়ে উঠলে বাড়তি ফলন কাজে লাগানো যেত। আপাতত ক্রেতারা কম দামে পেঁপে পাচ্ছেন, কিন্তু আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক হয়তো পেঁপে চাষ থেকেই সরে যাবেন।












