শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১১০ ডলারে উঠেছে। মের পর এটাই সর্বোচ্চ। খবরটি পড়ে অনেকে ভাবতে পারেন, এটা লন্ডন বা নিউইয়র্কের বাজারের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তেলের দাম কোনো দূরের সংখ্যা নয়। এটি সরাসরি পৌঁছায় চালের বস্তায়, বাসভাড়ায়, বিদ্যুৎ বিলে আর প্রবাসী পরিবারের ব্যাংক হিসাবে। উপসাগরে যে আগুন জ্বলছে, তার তাপ এরই মধ্যে ঢাকার কাঁচাবাজারে টের পাওয়া যাচ্ছে।
ঘটনাগুলো পরপর সাজালে ছবিটা পরিষ্কার হয়। ইয়েমেনে জুলাই থেকে গৃহযুদ্ধ নতুন করে জ্বলে উঠেছে। ইরানসমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, লোহিত সাগরের ট্যাংকার আর রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা করছে। গত সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে এক হামলাতেই ১৩ জন মারা গেছেন। শুক্রবার সৌদি জোট ইয়ানবু বন্দরের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পাঠানোর জন্য এই বন্দর সৌদি আরবের ভরসা। অন্যদিকে ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ আর নতুন নিষেধাজ্ঞার জবাবে তেহরান হরমুজের আশপাশে হামলা বাড়িয়েছে। রাশিয়া আর ইউক্রেনও একে অন্যের জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানছে। বিশ্বের তেল সরবরাহের দুটি বড় উৎস একসঙ্গে অনিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশ এই দুই উৎসের ওপরই নির্ভরশীল। আমাদের জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এর বড় অংশ আসে সৌদি আরব, আরব আমিরাত আর কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশ থেকে। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির দামও তেলের দামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ফলে তেলের দাম বাড়লে তিনটি পথে আঘাত আসে। প্রথম পথ আমদানি ব্যয়। প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লেও বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ হয়। সেই ডলার আসে রিজার্ভ থেকে, যা গত কয়েক বছরে অনেক কষ্টে স্থিতিশীল হয়েছে।
দ্বিতীয় পথ দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি। সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাজারে এক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা দায় দিচ্ছেন পরিবহন খরচকে। শাকসবজির বেশির ভাগ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। একজন ছোট খাবার ব্যবসায়ী হিসাব দিয়েছেন, চালের দাম কেজিতে এক টাকা বাড়ায় তাঁর মাসিক খরচ বেড়েছে ৩৬০ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের খরচ বাড়ে, ট্রাকভাড়া বাড়ে, সার আর কীটনাশকের দাম বাড়ে। শেষে সব গিয়ে জমা হয় খাবারের দামে। গ্রামের কৃষক যেমন সেচের ডিজেলের বাড়তি দাম গোনেন, শহরের রিকশাচালক তেমনি বাড়তি দামে চাল কেনেন। একই তেলের দাম দুজনকেই দুই দিক থেকে আঘাত করে। মাঝখানে লাভবান হয় শুধু মজুতদার আর সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী। গরিব পরিবার আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ খরচ করে খাবারে। তাই তেলের দাম বাড়ার আঘাত সবচেয়ে জোরে পড়ে তাদের ঘাড়েই।
তৃতীয় পথ প্রবাসী আয়। এটাই হয়তো সবচেয়ে কম আলোচিত, কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ প্রবাসী আয় শুধু রিজার্ভ নয়, গ্রামের লাখো পরিবারের দৈনন্দিন খরচের প্রধান উৎস। সৌদি আরব আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। হুতি হামলা আর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিধিনিষেধে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০০টি ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে গেছেন। এঁদের অনেকে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন, এখন ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ভয়ে আছেন। কেউ কেউ লাখ লাখ টাকা ধার করে বিদেশে চাকরি নিয়েছিলেন। ফিরতে না পারলে আবার নতুন ঋণ। লক্ষ করার বিষয় হলো, তেলের দাম বাড়লে সাধারণত উপসাগরীয় অর্থনীতি চাঙা হয়, শ্রমিকের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার দাম বাড়ছে যুদ্ধের কারণে। যুদ্ধ মানে প্রকল্প স্থগিত, নিয়োগ বন্ধ, আর শ্রমিকের নিরাপত্তা ঝুঁকি। তাই এবারের তেল সংকট বাংলাদেশের জন্য দ্বিগুণ ক্ষতির।
প্রশ্ন হলো, কী করা যায়। তেলের দাম আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিন্তু আঘাত কতটা লাগবে, তা অনেকটা আমাদের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের দৃশ্যমান উদ্যোগ দরকার। সরকারি গাড়ির ব্যবহার কমানো, অফিসে এসির তাপমাত্রা বেঁধে দেওয়া, দোকানপাট নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ করা। এসব ছোট পদক্ষেপ মিলে বড় সাশ্রয় হয়। ২০২২ সালের সংকটে এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সংকট কাটতেই সব আগের মতো হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি। খোলাবাজার থেকে চড়া দামে তেল আর এলএনজি কেনার বদলে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে নির্দিষ্ট দামের চুক্তি ঝুঁকি কমায়। সৌদি আরব, কাতার আর আমিরাতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। সংকটের সময়েই এই সম্পর্ক কাজে লাগানোর সুযোগ। একই সঙ্গে আটকে থাকা কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনাও এই কূটনীতির অংশ হতে পারে।
তৃতীয়ত, দেশের নিজস্ব জ্বালানিতে বিনিয়োগ। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান বছরের পর বছর পিছিয়েছে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ আর সেচে সৌর পাম্প বাড়ানোর কথা বহুবার হয়েছে। যত দিন আমরা আমদানি করা তেল আর গ্যাসের ওপর এত বেশি নির্ভর করব, তত দিন উপসাগরের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের বাজেটে আঘাত হানবে। প্রতিটি সংকট মনে করিয়ে দেয়, জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে জাতীয় নিরাপত্তা।
চতুর্থত, গরিবদের সুরক্ষা। মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমান পড়ে না। খোলাবাজারে চাল বিক্রি, ন্যায্যমূল্যের কার্ড আর শহরের দরিদ্রদের জন্য নগদ সহায়তা এখন বাড়ানো দরকার। আমন ধান ওঠার আগের দুই মাস বিশেষ নজরদারি জরুরি। বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার এখন সাড়ে ২২ শতাংশ। আরও ছয় কোটির বেশি মানুষ যেকোনো ধাক্কায় দারিদ্র্যে নেমে যেতে পারে। তেলের দামের এই ধাক্কা সেই ঝুঁকিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

অভিজ্ঞতাও আমাদের কিছু শেখায়। ২০২২ সালের আগস্টে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পর সরকার এক রাতে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশের বেশি আর অকটেনের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছিল। এর ধাক্কায় পরিবহন ভাড়া, কৃষি উপকরণ আর খাদ্যপণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ে। সেই মূল্যস্ফীতির রেশ কয়েক বছর ধরে থেকে গেছে। তখন লোডশেডিংও ফিরে এসেছিল, কারণ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এবারও একই আশঙ্কা আছে। তেলের দাম চড়া থাকলে সরকার আবার এক ধাক্কায় দাম বাড়ানোর দিকে যেতে পারে। কিন্তু হঠাৎ বড় সমন্বয়ের চেয়ে ধাপে ধাপে, আগাম ঘোষণা দিয়ে আর গরিবদের সুরক্ষা রেখে দাম ঠিক করা অনেক কম ক্ষতিকর। স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল, সেটি স্বচ্ছভাবে চালু থাকলে বাজারও আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে পারে। নীতির পূর্বাভাসযোগ্যতাই মূল্যস্ফীতির আতঙ্ক কমানোর সবচেয়ে সস্তা উপায়।
উপসাগরের যুদ্ধ কবে থামবে, কেউ জানে না। জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া হরমুজ দিয়ে তেলপ্রবাহ ধীরে আর অসমভাবে স্বাভাবিক হবে। অর্থাৎ উঁচু দাম কিছুদিন থাকবে বলেই ধরে নেওয়া ভালো। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন তাই একটাই। আমরা কি এবারও শুধু দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ঘাড়ে বোঝা চাপাব, নাকি সংকটকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনব? উত্তরটা ঠিক করবে, পরের সংকটে বাংলাদেশের রান্নাঘর কতটা নিরাপদ থাকবে।












