বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ। অর্থনীতি ধীরগতিতে বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়ছে? শুধু প্রবৃদ্ধি কমা ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা নিশ্চিত করা যায় না। তবে মানুষের আয় যদি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে খাদ্য কেনার সামর্থ্য কমে খাদ্যসংকট আরও গভীর হতে পারে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার মধ্যে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রবৃদ্ধি কমার অর্থ কী?
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির মন্থরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হওয়া মানেই অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে, এমন নয়। এর অর্থ হলো, অর্থনীতির মোট উৎপাদন বাড়বে, তবে তুলনামূলক ধীরগতিতে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায় কতটা পৌঁছাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতি বাড়লেও কর্মসংস্থান দুর্বল থাকলে, ব্যবসায় বিনিয়োগ কমলে কিংবা প্রকৃত আয় কমে গেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে।
১১ শতাংশ মূল্যস্ফীতিতে কেন বাড়ে খাদ্যসংকট?
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। আগের অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির অনুমান ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য কেনা যায়। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের ব্যয় বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে খাবারের পরিমাণ কমাতে, তুলনামূলক কম পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয় নির্দিষ্ট বা অনিয়মিত, কিংবা মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে খাদ্যবাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকলেও সবার পক্ষে প্রয়োজনীয় খাবার কেনা সম্ভব নাও হতে পারে।
দেশে কি ইতিমধ্যে খাদ্যসংকট রয়েছে?
খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি বুঝতে আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আইপিসির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তবে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা সবাই যে অনাহারে রয়েছেন, তা নয়। এই শ্রেণিবিন্যাসে খাদ্যের ঘাটতি, পরিবারের জীবিকা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা এবং সংকট মোকাবিলায় তাদের নেওয়া পদক্ষেপ বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন গড়ের চেয়ে বেশি হতে পারে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ।
অর্থাৎ দেশে খাদ্য উৎপাদন ভালো থাকলেও মানুষের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
দুর্ভিক্ষ বলতে কী বোঝায়?
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইপিসি পদ্ধতিতে দুর্ভিক্ষ নির্ধারণে শুধু খাদ্যের দাম বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করা হয় না। কোনো এলাকায় ব্যাপক খাদ্যাভাব, তীব্র অপুষ্টি এবং অতিরিক্ত মৃত্যুহারসহ বিভিন্ন সূচক একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়। দুর্ভিক্ষের শ্রেণিবিন্যাসের জন্য নির্দিষ্ট ও কঠোর মানদণ্ড রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসা কিংবা মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছানো—কোনোটিই দুর্ভিক্ষের প্রমাণ নয়। তবে এসব পরিস্থিতি মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য কমাতে পারে এবং আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সংকট বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় কী করা জরুরি?
খাদ্যসংকট মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো, খাদ্যের বাজারদর ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকা সুরক্ষিত রাখা জরুরি। যেসব এলাকায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বেশি, সেখানে সময়মতো খাদ্য ও নগদ সহায়তা পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ।
আইপিসি তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের জন্য খাদ্য ও নগদ সহায়তা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী: একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, অন্যদিকে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি বোঝা যাবে না।
তাহলে কি বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের দিকে যাচ্ছে?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে প্রায় ১১ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কোটি কোটি মানুষের তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার তথ্যকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
মূল ঝুঁকি হলো, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে গেলে খাদ্যসংকট গভীর হতে পারে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যের দাম, কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয় এবং পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে আছে কি না, তার উত্তর শুধু জিডিপির একটি সংখ্যা দিয়ে পাওয়া যাবে না। বরং দেশের মানুষ নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন কি না, সেই বাস্তব চিত্রই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাহলে কি দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?












