মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বিঘ্নিত হচ্ছে। ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০০টি ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে গেছেন। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা আর সৌদি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বিধিনিষেধ এর কারণ। গত সপ্তাহে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হামলাতেই ১৩ জন নিহত হন। সৌদি ফ্লাইট বিঘ্ন সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে তাঁদের, যাঁরা ধারদেনা করে বিদেশে কাজ নিয়েছেন।
সাতক্ষীরার মোহাম্মদ রেজাউল করিমের বয়স ৩০ বছর। সৌদি আরবে চাকরি নিতে সাড়ে চার লাখ টাকা ধার করেছিলেন। দুই বছর লেগেছে সেই ঋণ শোধ করতে। দাম্মামের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করেন তিনি। ছুটিতে দেশে এসে ১১ অক্টোবরের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আটকে আছেন। তাঁর ভিসার মেয়াদ শেষ হবে ৫ নভেম্বর। এর মধ্যে ফিরতে না পারলে আবার চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার করে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হবে। তাঁকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু নতুন ফ্লাইটের নিশ্চয়তা পাননি। বাবা মা, মেয়ে আর ছোট ভাইয়ের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ তিনি। রেজাউলের প্রশ্ন, গরিব না হলে কেন বিদেশে কাজ করতে যেতে চাইতাম? এই কর্মীদের বেশির ভাগই গ্রামের পরিবার থেকে আসা, যাঁদের কাছে কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষাও বড় আর্থিক ক্ষতি। তাঁরা চান সুনির্দিষ্ট সমাধান, শুধু আশ্বাস নয়।
এই প্রশ্নের পেছনে আছে বড় পরিসংখ্যান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে সাড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যে পড়েছে। আরও ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যেকোনো ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নামার ঝুঁকিতে আছে। এই পরিবারগুলোর অনেকের জন্য বিদেশে কাজই বের হওয়ার পথ।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। প্রবাসী আয়ের বড় অংশও আসে উপসাগরীয় দেশ থেকে। সৌদি ফ্লাইট বিঘ্ন দীর্ঘ হলে নতুন কর্মী পাঠানো কমবে। যাঁরা ছুটিতে দেশে আছেন, তাঁদের অনেকে ভিসা আর চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। এর প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স আর রিজার্ভে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ করে বিদেশে যাওয়া পরিবারগুলো সবচেয়ে অরক্ষিত। সমস্যা শুধু ফ্লাইটে নয়। যুদ্ধের অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে সৌদি নিয়োগকর্তারাও নতুন কর্মী নেওয়ায় ধীরে চলতে পারেন। সৌদি ফ্লাইট বিঘ্ন চলতে থাকলে এর প্রভাব পড়বে কর্মী পাঠানোর মাসিক হিসাবেও। গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। ভিসা আর কাজের অনুমতি ঘিরে যেকোনো জটিলতা তাই লাখো পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে। আটকে থাকা যাত্রীদের অনেকে এয়ারলাইনসের কার্যালয়ে ঘুরে নতুন তারিখ পাচ্ছেন না। বিমানবন্দরে একটি সরকারি সহায়তা ডেস্ক খোলা হলে তাঁরা অন্তত সঠিক তথ্য পেতেন।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। আটকে থাকা কর্মীদের তালিকা করে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা করা যেতে পারে। বিকল্প রুটে ফ্লাইট চালু আর এয়ারলাইনসগুলোর বিনা খরচে টিকিট পরিবর্তনের ব্যবস্থাও জরুরি। নইলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে হলেও ক্ষতির বড় অংশ বইতে হবে বাংলাদেশের গ্রামের পরিবারগুলোকে।












