আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছুঁয়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৯৪ ডলার বা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে। ১৯ মের পর এটাই সর্বোচ্চ। মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড বেড়ে হয়েছে ১০১ দশমিক ৪১ ডলার। এই সপ্তাহে ব্রেন্ট বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ আর ডব্লিউটিআই ১০ শতাংশের বেশি। জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য তেলের দাম ১১০ ডলার মানে আমদানি ব্যয় আর মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ।
দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, লোহিত সাগরের তীরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা ধ্বংস করেছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের কাছে এই বন্দর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক তথ্যে বন্দরের অবকাঠামোর ক্ষতি হয়নি। এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুতিরা রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালাচ্ছে। গত ১০ দিনে হরমুজ প্রণালির আশপাশে হামলাও বেড়েছে। ইরান বলছে, তাদের বন্দরে মার্কিন অবরোধ আর গত মাসের কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে তারা হামলা বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশকে প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। দাম বাড়লে ডলারের চাহিদাও বাড়ে, যা টাকার ওপর চাপ তৈরি করে।
রাশিয়া থেকে সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। ইউক্রেন বৃহস্পতিবার রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। রিয়াজান শোধনাগারের একটি প্রধান ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে হরমুজ দিয়ে তেলপ্রবাহ ধীরে আর অসমভাবে স্বাভাবিক হবে।
বাংলাদেশ তার জ্বালানি তেলের প্রায় সবটাই আমদানি করে। এর বড় অংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। দেশে সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাবে পরিবহন খরচ আর চালের দাম বাড়ছে। তেলের দাম ১১০ ডলারে থাকলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে। ভর্তুকি না বাড়ালে আবার দাম সমন্বয়ের চাপ আসবে। এলএনজির দামও তেলের সঙ্গে ওঠানামা করে, তাই গ্যাস আমদানির খরচও বাড়তে পারে। তেলের দাম ১১০ ডলারে স্থির থাকলে বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেট হিসাবও চাপে পড়বে। বাজেটে জ্বালানি ভর্তুকির যে অঙ্ক ধরা হয়েছিল, তা অনেক কম দামের ভিত্তিতে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে তখন হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো দেশের বাজারে আবার দাম সমন্বয় করতে হবে। দুটির কোনোটিই সহজ নয়। ভর্তুকি বাড়ালে উন্নয়ন খাতে টান পড়ে, দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লে বৈদেশিক ঋণের খরচও বাড়ে। আর রপ্তানির বাজারে চাহিদা কমলে পোশাক খাতও চাপে পড়তে পারে।
এর সঙ্গে আছে প্রবাসী আয়ের ঝুঁকি। সৌদি আরব আর উপসাগরীয় দেশগুলোতে লাখো বাংলাদেশি কাজ করেন। সেখানকার অস্থিরতা ফ্লাইট আর নিয়োগে প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, রিজার্ভ রক্ষায় এখনই জ্বালানি সাশ্রয়, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি আর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গতি আনা দরকার। শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমে, সেই সুযোগে মজুত বাড়ানোর পরামর্শও দিচ্ছেন তাঁরা।












