আজ পুরান ঢাকার লোহারপুল এলাকায় যানবাহনের ভিড়, দোকানপাট আর যন্ত্রাংশের ব্যবসার মধ্যে দাঁড়িয়ে অতীতের একটি সেতুর কথা কল্পনা করা কঠিন। অথচ এই এলাকাতেই একসময় ছিল ধোলাইখালের ওপর নির্মিত লোহার তৈরি একটি ঝুলন্ত সেতু। সেতুটির নাম ছিল লোহারপুল। স্থানীয় ইতিহাসে এটি সূত্রাপুর ব্রিজ নামেও পরিচিত। সেতুটি শুধু দুই পাড়ের যোগাযোগ সহজ করেনি, পুরান ঢাকার নগরজীবন, বাণিজ্য এবং সামাজিক ইতিহাসেরও অংশ হয়ে উঠেছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে নির্মিত এই সেতু ঢাকার নগর অবকাঠামোর ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে এর নির্মাণকাল ১৮২৮ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সেতুটি নির্মাণের সঙ্গে ঢাকার তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা ওয়াল্টারের নাম যুক্ত। ঐতিহাসিক সেতুর তথ্যভান্ডার ব্রিজমিস্টারে এর নাম ‘ওয়াল্টার্স ব্রিজ’ হিসেবেও নথিভুক্ত রয়েছে। তবে নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল নিয়ে সূত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে।
ধোলাইখাল: যে জলপথকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল পুরান ঢাকার জীবন
লোহারপুলের ইতিহাস বুঝতে হলে আগে জানতে হবে ধোলাইখালের কথা। একসময় এই খাল ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর একটি। শহরের প্রতিরক্ষা, পানি নিষ্কাশন, নৌযান চলাচল এবং পণ্য পরিবহনে এর ভূমিকা ছিল।
মুঘল আমলে ঢাকার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে খালটি নগরের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ধোলাইখালের বিভিন্ন অংশের ওপর একাধিক সেতু নির্মিত হয়েছিল। এসব সেতুর মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন পাড়া ও জনপদের মধ্যে স্থলপথে যোগাযোগ সহজ হতো। ১৮৫৯ সালের ঢাকার পৌর মানচিত্র নিয়ে করা গবেষণায় ধোলাইখালের ওপর থাকা একাধিক সেতুর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সূত্রাপুরের লোহারপুলও ছিল।
খালটির একটি অংশ সূত্রাপুর ও ফরাশগঞ্জের দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আশপাশের জনপদকে যুক্ত করত। বর্ষাকালে নৌযান চলাচলের সুযোগ থাকায় নদী ও খালনির্ভর পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই জলপথের গুরুত্ব ছিল। ধোলাইখাল দিয়ে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহায়তা করেছিল।
১৮২৮ থেকে ১৮৩২: লোহারপুল নির্মাণের ইতিহাস
ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ঢাকার বিভিন্ন জনপদের মধ্যে যোগাযোগের চাহিদা বাড়ছিল। ধোলাইখাল একদিকে নৌযান চলাচলের পথ, অন্যদিকে স্থলপথের প্রতিবন্ধকতা হওয়ায় এর ওপর সেতু নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকার তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওয়াল্টার এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কয়েকটি সূত্রে ১৮২৮ সালে নির্মাণকাজের সূচনার কথা বলা হয়েছে; অন্য সূত্রে ১৮৩১ বা ১৮৩২ সালকে সেতুর সমাপ্তি বা নির্মাণের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিজমিস্টারের ঐতিহাসিক তালিকায় ১৮৩১ সালকে সম্ভাব্য সমাপ্তির বছর ধরা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্মাণ-নথি ছাড়া একটি সালকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
লোহারপুল ছিল এক স্প্যানের ঝুলন্ত সেতু। সেতুর প্রধান কাঠামোয় লোহার ব্যবহার এবং ঝুলন্ত নির্মাণপদ্ধতি সে সময়ের ঢাকার জন্য উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য ছিল। এটি ধোলাইখালের দুই পাড়ের মধ্যে সরাসরি চলাচলের ব্যবস্থা করে।
সেতুটির সঙ্গে হাতি পার করে শক্তি পরীক্ষা করার একটি কাহিনিও প্রচলিত আছে। তবে এই ঘটনার সমসাময়িক লিখিত প্রমাণ নিশ্চিত করা না গেলে একে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে প্রচলিত বর্ণনা হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
সূত্রাপুর ও ফরাশগঞ্জের যোগাযোগে সেতুর ভূমিকা
লোহারপুলের গুরুত্ব শুধু তার নির্মাণপ্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেতুটি সূত্রাপুর ও ফরাশগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মধ্যে স্থলপথে যোগাযোগ সহজ করেছিল। এর ফলে মানুষ, পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চলাচলে সুবিধা তৈরি হয়।
পুরান ঢাকার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নৌপথের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বুড়িগঙ্গা থেকে বিভিন্ন জলপথে পণ্য আনা-নেওয়া হতো। ধোলাইখালের ওপর সেতু থাকায় জলপথ ও স্থলপথের মধ্যে সংযোগ আরও কার্যকর হয়েছিল।
তবে লোহারপুল দিয়ে ঠিক কী পরিমাণ পণ্য পরিবহন হতো, কোন কোন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এটি ব্যবহার করত কিংবা সেতুটি থেকে কতটা রাজস্ব আদায় করা হতো—এসব বিষয়ে আরও প্রাথমিক নথি প্রয়োজন। ১৮৬৭ সাল থেকে খালপথে চলাচলের ওপর টোল আরোপের তথ্য একটি ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। কিন্তু এই টোলের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও লোহারপুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
লোহারপুলকে ঘিরে লোকস্মৃতি ও নগরজীবন
পুরান ঢাকার অনেক ঐতিহাসিক স্থানের মতো লোহারপুলও স্থানীয় মানুষের স্মৃতি ও এলাকার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। সেতুটি না থাকলেও এর নাম টিকে রয়েছে। আজও লোহারপুল নামটি একটি এলাকার পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২০০৯ সালে একটি ফিচারে লেখক লোহারপুলকে ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়, ঢাকা সিটি করপোরেশন সেতুটি ভেঙে ফেলার পর এর সংরক্ষণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য জনপ্রতিবাদ দেখা যায়নি। একই লেখায় ধোলাইখালের ওপর মুঘল আমলের সেতুর ঐতিহ্য এবং পরবর্তী সময়ে ওয়াল্টারের নির্মিত ঝুলন্ত সেতুর ইতিহাস তুলে ধরা হয়।
এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, লোহারপুলের গুরুত্ব কেবল একটি সেতু হিসেবে নয়; এটি ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভূদৃশ্যের অংশ। সেতু, খাল, রাস্তা এবং আশপাশের পুরোনো ভবন মিলিয়ে যে নগরপরিবেশ গড়ে উঠেছিল, তার অনেক কিছুই পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেছে।
ধোলাইখালের সংকোচন ও সেতুর বিলুপ্তি
লোহারপুলের বিলুপ্তিকে ধোলাইখালের পরিবর্তনের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। সময়ের সঙ্গে খালটির বিভিন্ন অংশ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ভরাট হয়েছে, আবার কোথাও খোলা জলপথের পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ নিষ্কাশনব্যবস্থা বা বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।
ঢাকার ঐতিহাসিক জলাশয় ও সেতু নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় ধোলাইখালের ওপর একাধিক পুরোনো সেতুর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে লোহারপুলকে সূত্রাপুর এলাকার ঐতিহাসিক সেতু হিসেবে দেখানো হয়েছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, খালটির বড় অংশ বর্তমানে ভরাট বা বক্স কালভার্টের নিচে চলে গেছে।
বিভিন্ন বিবরণে লোহারপুলের অবস্থা ও অপসারণের সময় নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। একটি সেতুবিষয়ক নথিতে সেতুটিকে অপসারিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালের দ্য ডেইলি স্টার-এর ফিচারেও লেখক জানিয়েছেন, তিনি সেতুটি আর দেখতে পাননি এবং এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তবে সেতুটি ঠিক কোন সালে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা হয়, তা নির্দিষ্ট সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
সেতুটি হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধোলাইখালের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের দৃশ্যমান চিহ্নও মুছে যায়। বর্তমানে এলাকার নাম ও স্থানীয় স্মৃতিই সেই অতীতের পরিচয় বহন করছে।

স্থাপনা হারালেও ইতিহাস হারিয়ে যায় না
লোহারপুলের গল্প ঢাকার নগরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। একটি শহর যখন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, তখন যোগাযোগের নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই উন্নয়নের মধ্যে পুরোনো খাল, সেতু এবং জনপদের ঐতিহাসিক পরিচয় হারিয়ে যেতে পারে।
লোহারপুল ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর ঢাকার প্রকৌশল ও যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটি ধোলাইখালের দুই পাড়কে যুক্ত করেছিল এবং সূত্রাপুর ও ফরাশগঞ্জের নগরজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আজ সেতুটি নেই, খালেরও বড় অংশ দৃশ্যমান নয়। তবু লোহারপুল নামটি মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক ঢাকার ব্যস্ত সড়কের নিচে একসময় প্রবাহিত হতো জলপথ, আর সেই জলপথের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল একটি ঐতিহাসিক সেতু।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন পুরোনো মানচিত্র, ছবি, প্রশাসনিক নথি এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতি একত্র করা। কারণ লোহারপুলের মতো স্থাপনার ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নগরভূগোল ও ঐতিহ্যকে নতুন করে চেনারও একটি পথ।












