যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবার শুধু ওয়াশিংটনের ক্ষমতাসীন প্রশাসনের প্রতি জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের লড়াই নয়। এই নির্বাচন দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল—ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে এসব চাপ আরও বাড়িয়েছে। ফলে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তও এখন সরাসরি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
রিপাবলিকানদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষমতায় থাকার সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর পক্ষে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের প্রমাণ করতে হবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা করাই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান নয়; সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতেও তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে দুই দলের কোনোটিই এখনো এই প্রশ্নে একমত হতে পারেনি যে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নেতৃত্ব ও নীতিগত পরিবর্তনের মাত্রা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে বাণিজ্য, অভিবাসন এবং সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। এসব মতপার্থক্য শুধু নির্বাচনী প্রচারণাকে প্রভাবিত করছে না, বরং দুই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণের লড়াইকেও নতুন রূপ দিচ্ছে।
নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দলীয় অবস্থানের বিরোধিতা করা প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে জয়ী হলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারে। এতে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যের পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হবে। তাই এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন নির্ধারণ করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের ভেতরে কোন মতাদর্শ ও নেতৃত্বের ধারা আগামী দিনে বেশি গুরুত্ব পাবে।

ডেমোক্র্যাটদের সামনে নেতৃত্ব ও নীতির প্রশ্ন
ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রধান সংকট হলো, নির্বাচনী সাফল্য ফিরে পেতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা মধ্যপন্থার দিকে নিতে হবে, নাকি প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও নীতির বাইরে গিয়ে আরও বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
দলের মধ্যপন্থীরা মনে করেন, নিয়মিত ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া ভোটারদের বাইরেও সমর্থন বাড়াতে হবে। এ জন্য এমন প্রার্থী প্রয়োজন, যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ও আসনে মধ্যপন্থী এবং দোদুল্যমান ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন। তাঁদের মতে, অভিজ্ঞতা, বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি এবং কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনার সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
প্রগতিশীল অংশের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, করপোরেট স্বার্থের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় সীমিত উদ্যোগ এবং প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সতর্ক অবস্থান দলের জনভিত্তি দুর্বল করেছে। ভোটারদের আস্থা ফেরাতে হলে শুধু প্রচারণার ধরন বদলালে চলবে না; অর্থনৈতিক নীতি ও নেতৃত্বেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
এই মতবিরোধের পেছনে রয়েছে ভোটারদের প্রজন্মগত ও সামাজিক পার্থক্য। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তরুণ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রগতিশীল এবং প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ গোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। বয়স্ক সমর্থকদের মধ্যে দলীয় আনুগত্য এবং সামাজিক বিষয়ে মধ্যপন্থী মনোভাব বেশি দেখা যায়। ফলে বিতর্কটি শুধু কোন নীতি গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে নয়; বরং দলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শ্রেণি ও জাতিগত পরিচয় এই সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। উচ্চশিক্ষিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল উদারপন্থীরা প্রগতিশীল সামাজিক নীতির পক্ষে থাকলেও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা বজায় রাখতে পারেন। আবার অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ডেমোক্র্যাট জনসেবা সম্প্রসারণের পক্ষে থাকলেও অভিবাসন, আইনশৃঙ্খলা বা লিঙ্গবিষয়ক প্রশ্নে তাঁদের মতামত ভিন্ন হতে পারে। ফলে কোনো একটি গোষ্ঠীকে পুরো শ্রমজীবী বা সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
এই বাস্তবতায় মিশিগানের সিনেট নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। সেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে মধ্যপন্থী প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন আবদুল এল-সাইয়েদ। স্টিভেন্সের প্রতি সমর্থন ছিল সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমারের। অন্যদিকে এল-সাইয়েদ তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেন সর্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
প্রচারণায় ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্টিভেন্সের পক্ষে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছিল। এই লড়াইয়ে ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও মতবিরোধ প্রকাশ পায়। এল-সাইয়েদের জয় দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় দাতাগোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পাওয়া আর পুরো অঙ্গরাজ্যে জেতা এক বিষয় নয়। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এল-সাইয়েদকে দেখাতে হবে, তাঁর প্রগতিশীল কর্মসূচি বিস্তৃত ভোটারগোষ্ঠীর কাছেও গ্রহণযোগ্য।
ইসরায়েলনীতি নিয়ে বিতর্ক ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থী অংশকেও প্রভাবিত করছে। এপ্রিলে অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গ্যালেগো, যিনি ইসরায়েলপন্থী মধ্যপন্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতা করেন। তবে তিনি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় সমর্থন বজায় রাখেন। যুদ্ধের বাস্তবতা এবং জনমতের পরিবর্তন তাঁর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একই সঙ্গে প্রগতিশীল প্রার্থীদের নির্বাচনী সাফল্য নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।
উত্তর ক্যারোলাইনার নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য ভিন্ন কৌশল যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করছে। সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল ওয়াটলির বিরুদ্ধে লড়ছেন। দলের সিনেট নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া কুপার তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দুই দলের মধ্যে সহযোগিতা এবং সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি মেডিকেইড সম্প্রসারণের রেকর্ড তুলে ধরছেন।
কুপারের কৌশল হলো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচিকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা। অন্যদিকে এল-সাইয়েদ আরও ব্যাপক স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার এবং করপোরেট প্রভাব কমানোর পক্ষে। ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার প্রশ্নেও তিনি প্রতিষ্ঠিত দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধে রয়েছেন।
কুপার জয়ী হলে মধ্যপন্থীরা যুক্তি দিতে পারবেন, অভিজ্ঞ প্রার্থী ও প্রচলিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কারই ডেমোক্র্যাটদের পুনরুদ্ধারের কার্যকর পথ। এল-সাইয়েদ জিতলে প্রগতিশীলরা দেখাতে পারবেন, আরও উচ্চাভিলাষী নীতিও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের সমর্থন পেতে পারে।
দুই প্রার্থীই জয়ী হলেও বিতর্কের অবসান হবে না। বরং দুই পক্ষই নিজেদের কৌশলকে সাফল্যের কারণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থাকবে, কোন গোষ্ঠী দলের নীতিনির্ধারণ, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

রিপাবলিকানদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভবিষ্যৎ
রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রেও রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোটে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী, শ্রমজীবী ভোটার, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং রক্ষণশীল নীতির সমর্থকেরা রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সবার অগ্রাধিকার এক নয়। ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে দলটি আরও বেশি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে যাবে, নাকি প্রচলিত ব্যবসাবান্ধব রক্ষণশীলদের প্রভাব বাড়বে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শ্রমজীবী ভোটারদের একটি অংশ শুল্ক আরোপ, দেশীয় শিল্পে সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে রিপাবলিকানদের সমর্থন করে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত কম কর, নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনকে অগ্রাধিকার দেয়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদীরা দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে শুল্কের পক্ষে থাকলেও প্রচলিত অর্থনৈতিক রক্ষণশীলরা কর কমানো ও সরকারের আকার ছোট করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।
এই দুই অবস্থানের সংঘাত স্পষ্ট হয় যখন ব্যয় কমানোর নীতি সেইসব পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যাদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি ভোট চেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মেডিকেইডের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। ফলে রিপাবলিকানদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, ব্যবসায়ী সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে শ্রমজীবী ভোটারদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা হবে।
প্রজন্মগত পার্থক্যও দলটির ঐক্যকে জটিল করছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণে তুলনামূলক কম ধর্মীয় এবং তরুণ রিপাবলিকান-ঘেঁষা একটি গোষ্ঠীর কথা উঠে এসেছে, যারা অভিবাসন বিষয়ে রক্ষণশীল হলেও গর্ভপাত এবং স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভক্ত। ইসরায়েল বিষয়ে বয়সভিত্তিক পার্থক্য আরও স্পষ্ট। মে মাসের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী রিপাবলিকান ও রিপাবলিকান-ঘেঁষা স্বতন্ত্র ভোটারদের ৬৮ শতাংশ ইসরায়েল সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ৩৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই হার ২৮ শতাংশ।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অর্থ নিয়েও বিতর্ক বাড়িয়েছে। সামরিক অভিযানের সমর্থকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীলদের একটি অংশের যুক্তি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং বিদেশে সামরিক সহায়তায় বিপুল অর্থ ব্যয় দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। তাঁদের প্রশ্ন, ট্রাম্প প্রশাসন কি সত্যিই অন্তহীন যুদ্ধ এড়ানো এবং আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে?
কেন্টাকির চতুর্থ কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচন এই বিরোধের একটি উদাহরণ। ইরানের যুদ্ধ ও ইসরায়েলকে সহায়তার সমালোচক রক্ষণশীল প্রার্থী থমাস ম্যাসি মে মাসে রিপাবলিকান প্রাথমিক নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত এড গ্যালরেইনের কাছে পরাজিত হন। ম্যাসির বিরুদ্ধে প্রচারণায় ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোও অর্থায়ন করেছিল।
এই ফল দেখিয়েছে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভাষা ব্যবহার করেও ট্রাম্পের বিরোধিতা করলে নির্বাচনী মূল্য দিতে হতে পারে। প্রেসিডেন্টের সমর্থন কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং দলীয় বিদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতে রয়েছে। তবে ম্যাসির পরাজয় রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধ ও বিদেশি সহায়তা নিয়ে সব মতবিরোধের অবসান ঘটিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পেনসিলভানিয়ার প্রথম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। রিপাবলিকান ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করেছেন। মেডিকেইডে ব্যয় কমানোর কারণে তিনি প্রেসিডেন্টের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিলের চূড়ান্ত সংস্করণের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করতে কংগ্রেসের উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন।
তবু ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসের জেতা এই আসনে ফিটজপ্যাট্রিক পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাকে এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকেরা। তিনি জয়ী হলে রিপাবলিকানদের সেই অংশ শক্তিশালী হবে, যারা মনে করে জনসেবা রক্ষা এবং কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ট্রাম্পের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও ভোট ধরে রাখা সম্ভব।
ম্যাসির পরাজয় এবং ফিটজপ্যাট্রিকের সম্ভাব্য সাফল্য দেখায়, ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা সব জায়গায় একই ফল বয়ে আনে না। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক চরিত্র এবং স্থানীয় ভোটারদের অগ্রাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ট্রাম্পের উত্তরসূরিদের জন্য তাই মূল প্রশ্ন হবে, তাঁরা কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবেন। নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে নীতি পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে পারে। তবে তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাম্প-পূর্ব রিপাবলিকান নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটবে না। দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, অর্থনৈতিক সুরক্ষা, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সরকারি ব্যয় এবং পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব কি না, তার ওপর।

নভেম্বরের ফল থেকে ২০২৮ সালের দিকনির্দেশনা
নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দলীয় অবস্থান থেকে সরে আসা প্রার্থীরা জয়ী হলে উভয় দলের নীতিনির্ধারণে পরিবর্তনের চাপ বাড়বে। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এল-সাইয়েদের জয় সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, করপোরেট ক্ষমতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনার পক্ষে যুক্তি জোরালো করবে। এতে দলীয় নেতৃত্বের পক্ষে এসব অবস্থানকে নির্বাচনীভাবে ক্ষতিকর বলে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।
রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নীতির সমালোচক প্রার্থীদের সাফল্য ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণার নতুন ব্যাখ্যার দাবি বাড়াতে পারে। অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ও জনসেবায় ব্যয় কমানোর মধ্যে বিরোধ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও কিছু হিস্পানিক সমর্থকের স্বার্থের মধ্যে টানাপোড়েন এবং অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিদেশে যুদ্ধের ব্যয়ের সংঘাত—সবই এই চাপের উৎস। নির্বাচনী সাফল্য নীতি পরিবর্তনের পক্ষে থাকা রিপাবলিকানদের দলীয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে।
ইসরায়েলনীতি উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা এবং বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর পক্ষে থাকা রিপাবলিকানরা ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বিবেচনা করেন। কিন্তু প্রচলিত নীতির সমালোচকরা নির্বাচনে জয়ী হলে সামরিক সহায়তা সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের চাপ বাড়বে। জনমতের পরিবর্তন তখন আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পাবে, যখন নির্বাচনী ফল দেখাবে যে সেই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ভোটের হিসাবে লাভজনকও হতে পারে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রগতিশীল প্রার্থীদের সাফল্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের জাতীয় নেতৃত্বের দাবিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে কমলা হ্যারিস ও গ্যাভিন নিউজমের মতো প্রতিষ্ঠিত নেতাদের অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ইসরায়েলনীতি নিয়ে পরিবর্তনের দাবির প্রতি আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হতে পারে। তবে এই চাপ কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে প্রগতিশীলদের জয় কতটা বিস্তৃত এবং কোন কোন অঞ্চলে তা ঘটছে, তার ওপর।
রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিও উল্লেখযোগ্য। ভ্যান্স অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। রুবিওর পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি সামরিক শক্তিনির্ভর। ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করা প্রার্থীরা নির্বাচনে ভালো করলে তাঁদের দুজনকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক কর্মসূচির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রিপাবলিকান ভোটাররা ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যকে কতটা অগ্রাধিকার দেন এবং তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প ব্যাখ্যার প্রতি কতটা আগ্রহী হন, তার ওপর।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন আগেভাগেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্ধারণ করবে না। একইভাবে কয়েকটি আসনের ফল দুই দলের সব মতাদর্শগত বিরোধও মিটিয়ে দেবে না। এই নির্বাচনের গুরুত্ব অন্য জায়গায়: প্রতিষ্ঠিত নীতির বাইরে গিয়ে যাঁরা জয়ী হবেন, তাঁরা দলের ভেতরে নীতি, অর্থায়ন এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের শক্তিশালী দাবি তুলতে পারবেন। বিপরীতে, তাঁদের পরাজয় সংশ্লিষ্ট নীতিগুলোর পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে, যদিও ভোটারদের উদ্বেগগুলো থেকে যাবে।
সবশেষে, এই নির্বাচন পরীক্ষা করবে দুই দল নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে কার্যকর শাসনব্যবস্থার কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারে কি না। ডেমোক্র্যাটদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও ধাপে ধাপে সংস্কারের বাইরে তারা কতটা এগোতে প্রস্তুত। রিপাবলিকানদের নির্ধারণ করতে হবে, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণাকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ধরে রাখা সম্ভব।
নভেম্বরের নির্বাচনের প্রভাব তাই কংগ্রেসে কোন দল বেশি আসন পেল, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হতে পারে, আমেরিকার রাজনীতিতে আগামী পর্যায়ে কোন ধারণা প্রাধান্য পাবে, কারা জাতীয় নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্য দাবিদার হয়ে উঠবেন এবং ২০২৮ সালে ভোটারদের সামনে কী ধরনের রাজনৈতিক বিকল্প হাজির হবে। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কোন দল জিতবে তা নয়; বরং বিজয়ের অর্থ ও ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের ক্ষমতা সেই দলের কোন অংশের হাতে যাবে।












