যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোট শুরুর প্রাক্কালে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার জল্পনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে অঞ্চলটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। বিমানবন্দরে হামলা, আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল এবং যাতায়াতে বিঘ্নের আশঙ্কায় ভ্রমণকারীদের আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
১৮ অক্টোবর জারি করা নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সেখানে থাকা মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে দূতাবাস।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া বা সেখান থেকে অন্যত্র যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজ সংস্থার সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিল কিংবা আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখতে হবে। বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, মার্কিন নাগরিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ইরান এবং তেহরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে জল্পনা
নিরাপত্তা সতর্কতার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে খবর সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বরাতে এএনআই জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে হামলার অতিরিক্ত বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে। এসব বিকল্পের মধ্যে জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বা ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও রয়েছে। তবে হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ ও ‘শান্তির অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। ইরান অবস্থান পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা শিগগিরই অভিযান শেষ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, আগেরবার যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শেষ করার চেষ্টা করেও ইরানকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে পেয়েছে। নতুন করে সংঘাতের চেষ্টা করলে তেহরানও প্রস্তুত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যার পরিণতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়কেই ভোগ করতে হতে পারে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা ও ফ্লাইট বিপর্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলার খবরের পর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত ছিল। অন্যদিকে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম চললেও ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের ঘটনা ঘটেছে।
সৌদি আরবে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতির বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন। মিশনপ্রধানের অনুমতি ছাড়া তাঁদের কোনো বিমানবন্দর ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকদেরও যাত্রার আগে সরাসরি বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দৃশ্য, ড্রোনের কার্যক্রম কিংবা হামলার স্থান ধারণ করে ছবি তোলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ডে আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় মার্কিন নাগরিকদের আটক হওয়ার ঘটনাও দূতাবাসের সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হুথি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি বাহিনী ১১০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০ জনের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে তাঁর দাবি, যাঁদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। তবে সরবরাহ করা তথ্যে এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের প্রমাণ নেই।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ
আঞ্চলিক উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হচ্ছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোট। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আম্মানের মার্কিন দূতাবাস নাগরিকদের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্মার্ট ট্রাভেলার এনরোলমেন্ট প্রোগ্রামে নিবন্ধনের পরামর্শ দিয়েছে। এর মাধ্যমে নিরাপত্তাসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া বিক্ষোভ ও বড় জমায়েত এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকা এলাকা থেকে দূরে থাকা, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম অনুসরণ করা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। আকাশপথে হামলা হলে কাচের দরজা-জানালা ও পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ থেকে দূরে থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের মোবাইল ফোন চার্জ রাখা, আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট স্থানে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, আম্মানে তাদের নিয়মিত নাগরিকসেবা ও ভিসাসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোট শুরুর সময়ে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলের ঝুঁকি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা সতর্কতাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।












