টোকিওর আকাশে ঘনিয়ে আসছে টাইফুন। রাস্তায় ঝরছে বৃষ্টি। সন্তানদের নিয়ে ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন অভিভাবকেরা। পর্যটকেরা ছুটছেন নিরাপদ জায়গায়। কিন্তু শিনজুকু চুও পার্কে স্যুট, লাল টাই ও কেডস পরে এক ব্যক্তি নেচেই চলেছেন। কখনো পায়ের গোড়ালি ঠুকছেন, কখনো শরীর দুলিয়ে ছন্দ তুলছেন, আবার কখনো ‘সিংগিন ইন দ্য রেইন’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যের অনুকরণে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, লাফিয়ে উঠছেন বাতাসে।
এই মানুষটির নাম তোরু উতসুমি। বয়স ৬০ বছর। পেশায় ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পরিচিত ‘নাচতে থাকা বেতনভোগী’ হিসেবে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। করপোরেট জীবনের কঠোর নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচের ভিডিও তৈরি করে তিনি জয় করেছেন বিশ্বের নানা দেশের মানুষের মন।
তোরুর কাছে নাচ কেবল বিনোদন নয়, নিজের মন ভালো রাখারও উপায়। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যত বেশি নড়াচড়া করি, আমার মনোবল তত বাড়ে। একসময় নিজেকে ভালো লাগতে শুরু করে।’
নাচের জন্য কোনো জায়গাই বাধা নয়
ট্রেন স্টেশনের বাইরে, উঁচু ভবনের ছাদে, প্রাচীন দুর্গের কাছে, হোটেলের ছোট ঘরে, খোলা মাঠে কিংবা সমুদ্রসৈকতে—তোরুকে নাচতে দেখা যায় নানা জায়গায়। কখনো মাথায় বেরেট টুপি ও পরনে হাফপ্যান্ট পরে তিনি কিউবান সংগীতের সঙ্গে তাল মেলান। কখনো নিয়ন আলোর নিচে কলার দেওয়া ঝকঝকে শার্ট পরে জাপানি পপসংগীতের তালে নাচেন।

তাঁর নাচের ধরনও বিচিত্র। কখনো ডিগবাজি দেন, কখনো দুই পা ছড়িয়ে বসে পড়েন, আবার কখনো প্রজাপতির মতো লাফিয়ে ওঠেন। কোন গানে আগে নেচেছেন, সেটিও তাঁর হিসাবের বাইরে থাকে না। এক হাজারের বেশি গানের তালিকা স্প্রেডশিটে সাজিয়ে রেখেছেন, যাতে একই গানে বারবার নাচতে না হয়।
তবে জাপানের সবাই তাঁর এই কর্মকাণ্ডকে ভালোভাবে নেন না। দেশটির অনেক মানুষ প্রকাশ্য স্থানে শৃঙ্খলা, নীরবতা ও নিয়ম মেনে চলাকে গুরুত্ব দেন। তাঁদের চোখে তোরু কখনো বিরক্তির কারণ, কখনো নিয়ম ভাঙা এক মানুষ। কেউ তাঁকে বলেন অপরিপাটি, কেউ বলেন শৃঙ্খলাহীন। আবার কারও মতে, এই বয়সে তাঁর এমন নাচ মানায় না।
তোরু নিজেও জানেন, প্রকাশ্যে নাচলে অন্যদের চোখে পড়বেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, অন্যদের চেয়ে আমাকে আলাদা দেখায়। সে কারণেই আমার মতো একজন সাধারণ বেতনভোগী মানুষের পক্ষে এভাবে নাচা খুব কঠিন।’
বিদেশে ভক্তের অভাব নেই
নিজ দেশে সমালোচনা থাকলেও বিদেশে তোরুর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বেড়েছে। তাঁর নাচের সঙ্গে সরাসরি অংশ নিতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে জাপানে আসেন অনেকে। তাঁদের কাছে তিনি টোকিওর বিখ্যাত শিবুয়া ক্রসিং কিংবা টোকিও টাওয়ারের মতোই পরিচিত এক আকর্ষণ। এই দুই জায়গাতেই নেচেছেন তোরু।
সম্প্রতি ইতালির তরুণ আইনজীবী রবার্তো চিম্মিনো তাঁর সঙ্গী চিয়ারা কোমুজ্জিকে নিয়ে ১৭ দিনের জাপান সফরে গিয়ে তোরুর সঙ্গে নাচার সুযোগ পান। টোকিও স্টেশনের বাইরে এক বিকেলে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তোরু। বহনযোগ্য স্পিকারে ইতালীয় শিল্পী লিওনে দি লের্নিয়ার ‘ম্যাগনান্দো’ গান বাজতে থাকে। তিনজন কোমর দুলিয়ে, লাফিয়ে এবং একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন।
চিম্মিনোর কাছে তোরুর ভিডিওর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবর দেখতে দেখতে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তোরুর ছোট্ট একটি নাচের ভিডিও মন ভালো করে দিতে পারে।

চিম্মিনো বলেন, ‘তাঁর নাচ কিংবা ছন্দে মেতে থাকার ছোট্ট একটি ভিডিওই আপনার মেজাজ বদলে দিতে পারে, মুখে হাসি ফোটাতে পারে। তিনি যেন আনন্দ তৈরির এক যন্ত্র।’
বিদায়ের সময় তোরুকে তিনটি শব্দ বলেছিলেন তিনি—‘নাচতে থাকুন!’
শৈশব থেকেই অন্য রকম
তোরুর বেড়ে ওঠা জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কিউশু দ্বীপে। তাঁর শৈশব কেটেছে কিছুটা ব্যতিক্রমী পরিবেশে। তাঁর বাবা ছিলেন লুথেরান ধর্মযাজক। বিভিন্ন গির্জায় দায়িত্ব পাওয়ায় পরিবারকে বারবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হতো। ফলে ছোটবেলা থেকেই তোরুর মধ্যে একাকিত্ব তৈরি হয়েছিল। প্রচলিত জাপানি সমাজের সঙ্গে নিজেকে অনেক সময় আলাদা মনে হতো তাঁর।
নাচের প্রতি আকর্ষণ শুরু হয়েছিল কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময়। পরিবারের গির্জার সঙ্গে যুক্ত একটি হলঘরে ব্যালে নৃত্যশিল্পীদের দেখে তাঁদের অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করতেন তিনি।
১৯৮০-এর দশকে স্কুলে পড়ার সময় টোকিওর রাস্তায় নাচতেন টুইস্ট। তখন জাপানে রাস্তায় সংগীত পরিবেশনের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। পাশাপাশি একটি হেভি মেটাল ব্যান্ডে গিটারও বাজাতেন তিনি।
তোরুর প্রিয় শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন কিথ রিচার্ডস ও মিক জ্যাগার। বিশেষ করে মিক জ্যাগারের কোমর দোলানোর ভঙ্গি তাঁকে আকৃষ্ট করত। সেই ভঙ্গির মধ্যে থাকা অনুভূতি ও আবহ অনুকরণ করতে চাইতেন তিনি।
তোরু বলেন, ‘শুরুর দিকে আমার প্রতিভা ছিল না, কিন্তু আগ্রহ ছিল।’
আশির দশকের শেষ দিকে জাপানের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় রাতের বিনোদনজগৎ ছিল বেশ জমজমাট। সেই সময় ডিসকো হল ও বিভিন্ন ক্লাবে নিয়মিত যেতেন তোরু। রেগে সংগীতের প্রতিও গভীর ভালোবাসা তৈরি হয় তাঁর। ধীরে ধীরে নিজের ব্যতিক্রমী ও কিছুটা খামখেয়ালি নাচের ধরন গড়ে তোলেন তিনি।

করপোরেট জীবনের চাপ থেকে মুক্তির পথ
নাচের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও জীবনের বড় একটি সময় তোরু কাটিয়েছেন করপোরেট জগতে। কর্মজীবনের শুরুতে ফটোকপিয়ার বিক্রির কাজ করতেন। দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ে উঠে যান। কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ অধস্তন কর্মীদের সামলাতে গিয়ে মানসিক চাপে পড়তেন।
একসময় বিক্রির কাজ ছেড়ে স্বাধীন ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, নির্বাহীদের এমনভাবে নেতৃত্ব দিতে শেখানো, যাতে কর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা ও যত্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০১৮ সালে, ৫২ বছর বয়সে, সৃজনশীল কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তোরু। তখনই নিয়মিত নাচ শেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে সামাজিক নাচের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও প্রবীণদের মধ্যে নাচ শেখার আগ্রহ বাড়ছে। শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং অবসরকে আনন্দময় করে তোলার জন্য তাঁরা নাচকে বেছে নিচ্ছেন।
তোরুর নাচের প্রশিক্ষক সাচিকো নাগাতোমোর মতে, তাঁর নাচের ধরন অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক। নির্ধারিত নাচের ধাপ অনুসরণ করতে তিনি কিছুটা সমস্যায় পড়েন। কিন্তু তাঁর শরীরের ভঙ্গি, ছন্দ বোঝার সহজাত ক্ষমতা এবং অভিনব উপস্থিতি দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
নাগাতোমো বলেন, ‘তিনি নাচ শুরু করার মুহূর্তেই দর্শকদের মনোযোগ পুরোপুরি কেড়ে নেন। এরপর তাঁদের দৃষ্টি তাঁর ওপর আটকে থাকে।’
প্রশিক্ষকের মতে, তোরুর সাফল্যের মূল কারণ তাঁর স্বতন্ত্র, প্রাণবন্ত ও বাধাহীন নাচের ধরন।

প্রতিদিনের ভিডিও থেকে তারকা
২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচের ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন তোরু। হিপহপ, ডিসকো, রকাবিলি ও সোল সংগীতের মতো নানা ধারার গান বেছে নেন তিনি। প্রায় প্রতিদিন ভিডিও প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের নাচের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।
একটি ব্লগে তিনি লিখেছিলেন, প্রকাশ্যে নিজের লক্ষ্য ঘোষণা করলে কাজে ঢিলেমি করার সুযোগ কমে যায়।
সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। এখন বিজ্ঞাপন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও দেখা যায় তাঁকে।
মঙ্গলবার ও রোববার তাঁর ছুটির দিন। এসব দিনে নাচের ভিডিও ধারণ করেন। আবার ব্যবসায়িক সফর কিংবা বৈঠকের মাঝেও সুযোগ বের করে নেন। করপোরেট জগতের সহকর্মীরা তাঁর এই পরিচয় মেনে নিয়েছেন। তাঁদের কাছে এটি তোরুর স্বাভাবিক জীবনযাপনেরই অংশ। তবে তাঁর অনেক গ্রাহক যে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচের তারকা, সে সম্পর্কে জানেন না।

সমালোচনা থাকলেও থামতে চান না
জনপ্রিয়তা বাড়লেও প্রকাশ্যে নাচার সময় এখনো কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেন তোরু। ভিডিও ধারণ শেষ হলে দ্রুত সরঞ্জাম গুছিয়ে ফেলেন। এরপর টোকিওর ব্যস্ত জনতার ভিড়ে মিশে যান।
কখনো পথচারীরা বিরক্তি প্রকাশ করেন। কেউ কেউ জানতে চান, প্রকাশ্যে নাচার অনুমতি আছে কি না। তোরু অবশ্য এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের দিকে তাকিয়ে হাসেন।
সমাজ বদলে দেওয়ার কোনো বড় লক্ষ্য তাঁর নেই। ষাটের কোঠায় থাকা সব পুরুষকে একসঙ্গে নাচতে নামানোর পরিকল্পনাও করেন না তিনি।
তোরুর কথায়, ‘সমাজ বদলে দেব কিংবা বলব, ষাটের কোঠায় থাকা পুরুষেরা সবাই মিলে কঠোর পরিশ্রম করি—এমন কোনো বড় লক্ষ্য আমার নেই। তবে মানুষ যদি আমাকে আনন্দ করতে দেখে নিজেরাও নতুন কিছু করার চেষ্টা করে, সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।’
তোরুর গল্প তাই শুধু একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষের নাচের গল্প নয়। এটি বয়স, পেশা ও সামাজিক প্রত্যাশার সীমা পেরিয়ে নিজের পছন্দের কাজ করে যাওয়ার গল্প। যে সমাজে নিয়ম মেনে চলা এবং অন্যের চোখে গ্রহণযোগ্য থাকার চাপ প্রবল, সেখানে তাঁর নাচ মনে করিয়ে দেয়—আনন্দ খুঁজে নেওয়ার জন্য সব সময় বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো বৃষ্টিভেজা একটি পার্ক, পছন্দের একটি গান আর নিজের মতো করে নাচার সাহসই যথেষ্ট।













