পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল ব্যর্থ হওয়াকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নেতৃত্বের মধ্যে দোষারোপ বাড়ছে। কর্মসূচি আয়োজনের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং কৌশল নির্ধারণ নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে দলটির নেতারা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
দলের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে মতবিরোধের খবর নাকচ করার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও জবাব দেন।
রাজা বলেন, এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। তিনি আফ্রিদিকে সাহসী তরুণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের আদর্শের প্রতি তিনি অবিচল রয়েছেন। তবে বিক্ষোভ মিছিলের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে আফ্রিদিকে ঘিরে ছড়ানো বিভিন্ন বক্তব্যের যথাযথ জবাব দেওয়া যায়।
রাজা আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে।
কর্মসূচির তারিখ ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন
তবে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, বিক্ষোভ মিছিল ব্যর্থ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।
ওই নেতা জানান, শনিবার রাত ১০টার পর বৈঠক শুরু হয়ে রাত ২টার পর শেষ হয়। কমিটির ১৬ জন সদস্য সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বাকি সদস্যরা পরবর্তী বৈঠকগুলোতে নিজেদের মতামত তুলে ধরবেন।
তিনি বলেন, বৈঠকের শুরুতে পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করার কথা জানান। তবে সালমান আকরাম রাজা প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ মিছিলের তারিখ কীভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তা নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে জানা যায়, আগস্টে সোহেল আফ্রিদি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় একটি সভা ডাকেন। এতে ব্যারিস্টার গওহর, সালমান আকরাম রাজা, আসাদ কায়সার, শফিউল্লাহ জান, মিনা খান, শহিদ খাতাক ও তৈমুর ঝাগরা উপস্থিত ছিলেন।
ওই সভায় আফ্রিদি ২৭ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের ঘোষণা দেন। পরে এ তথ্য কয়েকজন ভ্লগারের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। কর্মসূচির তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে দলের রাজনৈতিক কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনা হয়নি—এমন সমালোচনা শুরু হলে একই দিনে দুই কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। পরে সন্ধ্যায় একটি জনসভায় কর্মসূচির তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন আফ্রিদি।
প্রস্তুতি ও কৌশল সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন নেতারা
দলের ওই জ্যেষ্ঠ নেতার দাবি, বিক্ষোভ মিছিলের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার বৃহত্তর কৌশল সম্পর্কে দলের অনেক শীর্ষ নেতাকে অবহিত করা হয়নি।
তিনি জানান, বৈঠকে বলা হয়, বিক্ষোভের পরিকল্পনা সম্পর্কে আফ্রিদিকে একাধিকবার প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বিস্তারিত জানাননি। এতে দলের অন্য নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয়, সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে পিটিআইয়ের আলোচনাকারী দল বৈঠক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে এ সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার আশঙ্কা তৈরি হলে ইমরান খানের নাম এবং তাঁর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি সামনে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বৈঠকে দাবি করা হয়েছে।
আফ্রিদি গ্রেপ্তার হওয়ার পরও কেন বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করা হয়নি, তা নিয়ে সালমান আকরাম রাজা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সমন্বয় কমিটির প্রধান আলী আসগর খানকে প্রশ্ন করেন বলে জানান ওই নেতা।
প্রয়াত বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল আসগর খানের ছেলে আলী আসগর খান দাবি করেন, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি আফ্রিদি ও জুনায়েদ আকবরকে একাধিকবার কর্মসূচির বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানিয়েছিলেন, পরে পরিকল্পনা জানানো হবে।
এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক সদস্য ক্ষুব্ধ হন বলে জানান ওই নেতা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, জনশৃঙ্খলা রক্ষা আইনে দলের ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
আলোচনা ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিতর্ক
বৈঠকে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণ নিয়েও কথা হয়। পিটিআইয়ের আরেক নেতা জানান, দলের নেতা হালিম আদিল শেখ স্বীকার করেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য বিরোধী পক্ষ ৭০ শতাংশ এবং সরকার ৩০ শতাংশ দায়ী।
ওই নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি সংশোধিত একটি চুক্তির খসড়া নিয়ে আসার পর দুই পক্ষ তাতে সম্মত হয়। ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর আফ্রিদির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইমরান খানের সঙ্গে পরামর্শ না করে ওই বৈঠক করা সম্ভব নয়। এ ঘটনাও আলোচনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি করে বলে বৈঠকে উঠে আসে।
এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে টিটিএপি কার্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ব্যারিস্টার গওহর অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক নেতার দাবি, রউফ হাসান এ বিষয়ে আপত্তি জানান। জবাবে ব্যারিস্টার গওহর বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেননি।
নতুন বিক্ষোভের প্রস্তাবেও ঐকমত্য নেই
বৈঠকে সিমাবিয়া তাহির পিটিআইকে নতুন করে বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেছেন ওই নেতা। তবে অধিকাংশ সদস্য মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে এমন কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব নয়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় তথ্যসচিব শেখ ওয়াকাস আকরাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দলের অভ্যন্তরীণ এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, বিক্ষোভ মিছিল ব্যর্থ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পিটিআইয়ের নেতৃত্বের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বয় এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশ্যে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হলেও কর্মসূচির প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ এখনো কাটেনি।












