ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, বাগান ও কৃষিজমি। আগুনের বিস্তার দেশটির বন ও জলাভূমি সংরক্ষণভিত্তিক চারটি কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এসব প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর বনভূমি রক্ষা করে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাব্য লেনদেনমূল্য প্রায় ২৮০ কোটি ডলার।
তবে এই দাবানলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাই নয়, বিপন্ন হচ্ছে বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা। বিশেষ করে বনাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় তিন হাজার ওরাংওটাংসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল
ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র দাবানলের সঙ্গে লড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের বিলম্ব এবং ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতির কারণে আগুনের প্রভাব আরও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দাবানলের ধোঁয়ায় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
আগুনের বিস্তার ঠেকাতে প্রকল্প এলাকাগুলোতে শত শত মানুষ কাজ করছেন। বোর্নিও দ্বীপে দুটি এবং সুমাত্রায় দুটি প্রকল্প অবস্থিত। প্রচণ্ড গরম ও ঘন ধোঁয়ার মধ্যে কর্মীরা আগুন যাতে সংরক্ষিত বনভূমিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত কার্বনসমৃদ্ধ বনভূমিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ইন্দোনেশিয়ার বনমন্ত্রী রাজা জুলাই আন্তোনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দাবানল ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে।
ঝুঁকিতে চারটি বন সংরক্ষণ প্রকল্প
ঝুঁকির মুখে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্য কালিমানতান প্রদেশের কাতিঙ্গান মেন্তায়া প্রকল্প, দক্ষিণ সুমাত্রার মেরাং পিটল্যান্ড প্রকল্প, পশ্চিম কালিমানতানের মায়াস প্রকল্প এবং জাম্বি প্রদেশের বুজাং রাবা কমিউনিটি ফরেস্ট্রি প্রকল্প।
এসব প্রকল্পে বন ও পিটল্যান্ড নামে পরিচিত জৈব পদার্থসমৃদ্ধ জলাভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো হয়। কতটুকু নিঃসরণ ঠেকানো সম্ভব হয়েছে, তা হিসাব করে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়। পরে সেই হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি কার্বন ক্রেডিট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়।
পাঁচ বছরের বিরতির পর আইনি জটিলতা নিরসন এবং একই ক্রেডিট একাধিকবার বিক্রির ঝুঁকি মোকাবিলায় পুনর্গঠনের মাধ্যমে গত জুলাইয়ে কার্যক্রমটি আবার শুরু হয়। চারটি প্রকল্পের কার্বন ক্রেডিটের আনুমানিক লেনদেনমূল্য ৫ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ, যা প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের সমান।
আগুন ঠেকাতে পানি, খাল ও ড্রোন
কাতিঙ্গান মেন্তায়া প্রকল্পের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ হেক্টর। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান রিম্বা মাকমুর উতামার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ধরসোনো হার্তোনো জানিয়েছেন, আগুনের বিস্তার ঠেকাতে প্রকল্প এলাকা ও আশপাশে কাজ চলছে।
প্রকল্প এলাকায় বনভূমির বাইরের চারটি স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু বনাঞ্চলও প্রভাবিত হয়। দমকলকর্মীরা আগুনের বিস্তার থামাতে সক্ষম হয়েছেন। এখন দীর্ঘ পাইপের সাহায্যে পিটল্যান্ডের গভীরে পানি পৌঁছে দিয়ে মাটির নিচে জ্বলতে থাকা আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে।
পিটল্যান্ডকে আগুন থেকে রক্ষার কার্যকর উপায় হলো মাটি আর্দ্র রাখা। এ জন্য প্রকল্প এলাকায় ১০০টির বেশি খাল ও বাঁধ, ৫৫৯টি অগ্নিনির্বাপণ কূপ এবং ১৯৮টি জলাধার রয়েছে। প্রতিদিন মোটরসাইকেল ও নৌকায় ১৮ থেকে ২২টি টহল দেওয়া হয়। তাপ শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ১৯টি ড্রোন। পাশাপাশি আগুনের বিস্তার ঠেকাতে আর্দ্র গাছপালার সুরক্ষাবলয় তৈরি এবং দাহ্য উদ্ভিদ সরিয়ে ফাঁকা জমি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বন পুড়লে হারিয়ে যেতে পারে ওরাংওটাং ও ঔষধি উদ্ভিদ
বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতি শুধু কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ সুরক্ষা বিভাগের অধ্যাপক দামায়ান্তি বুচোরির মতে, কাতিঙ্গান মেন্তায়া প্রকল্পের সংরক্ষিত বন পুড়ে গেলে প্রায় তিন হাজার ওরাংওটাংসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাতে পারে। ধ্বংস হতে পারে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, স্থানীয় মানুষের খাদ্যের উৎস এবং ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত গাছপালা।
বন ধ্বংস হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ও জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় পরিচালিত গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কার্বন ক্রেডিটের হিসাবেও পড়বে প্রভাব
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে ইস্যু করা ১ কোটি ৭৩ লাখ কার্বন ক্রেডিটের ওপর চলতি বছরের দাবানলের প্রভাব পড়বে না। কারণ, এসব ক্রেডিট ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের কার্যক্রমের ফলাফলের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০২৬ সালে আগুনের কারণে প্রকল্প এলাকায় কার্বন নিঃসরণ বাড়লে তা ওই বছরের পর্যবেক্ষণে হিসাব করা হবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী ওই বছরের উৎপাদিত কার্বন ক্রেডিট থেকে সংশ্লিষ্ট ক্ষতি বাদ দেওয়া হতে পারে।
এনার্জি শিফট ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পুত্রা আধিগুনা বলেছেন, বারবার দাবানল দেখা দেওয়ায় বন সংরক্ষণভিত্তিক কার্বন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জলবায়ু সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন ও পিটল্যান্ডের ঝুঁকিও বাড়বে বলে স্বীকার করেছেন ধরসোনো হার্তোনো। তবে তাঁর মতে, ঝুঁকি বাড়ছে বলে পরিবেশ সংরক্ষণের চেষ্টা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।












