ভারতে ২০২৬-২৭ সরবরাহ বছরে পেট্রলের সঙ্গে মেশানোর জন্য আখের রস, চিনি, চিনির সিরাপ ও বি-হেভি মোলাসেস থেকে উৎপাদিত ইথানল কেনা বন্ধ করেছে তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো। দেশে চিনির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের মতো প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এবার চিনির উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ সরবরাহ বছরে ইথানল উৎপাদনে চিনির ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। গত ১৬ অক্টোবর ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেডের (বিপিসিএল) জারি করা সর্বশেষ দরপত্রে এ নির্দেশনা প্রতিফলিত হয়েছে। তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে জারি করা দরপত্রে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সরবরাহ বছরের জন্য প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি লিটার ইথানল কেনার প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ পরিমাণ ইথানল প্রয়োজন।
আখ থেকে ইথানল উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, আখের রস, চিনি, চিনির সিরাপ এবং বি-হেভি মোলাসেস থেকে তৈরি ইথানল সরবরাহের কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। এর বদলে ভুট্টা, ভাঙা চাল, ভারতের খাদ্য করপোরেশনের উদ্বৃত্ত চাল এবং সি-হেভি মোলাসেস থেকে উৎপাদিত ইথানল সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তে ভারতের ইথানল মেশানোর কর্মসূচিতে কাঁচামাল সংগ্রহে বড় পরিবর্তন আসছে। এত দিন এ কর্মসূচিতে শস্য ও আখ, দুই উৎস থেকেই ইথানল ব্যবহার করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ।
ভুট্টার ইথানলে কমছে প্রণোদনা
নতুন দরপত্রে ভুট্টা থেকে উৎপাদিত ইথানলের ক্রয়মূল্যও কমানো হয়েছে। প্রতি লিটারের দাম ৭১ দশমিক ৮৬ রুপি থেকে কমিয়ে ৬৮ দশমিক ৮৬ রুপি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুট্টার ইথানলে অতিরিক্ত প্রণোদনা প্রতি লিটারে ৫ দশমিক ৭৯ রুপি থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৭৯ রুপি করা হয়েছে।
এতে ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমতে পারে। অন্যদিকে আখ থেকে ইথানল বাদ পড়ায় বিকল্প কৃষিপণ্যের গুরুত্ব বাড়বে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল, ক্রয়মূল্য এবং কারখানাগুলোর সক্ষমতা এখন সরবরাহের লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চিনির সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ
ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিনি ব্যবহারকারী দেশ। দেশটিতে চিনির অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি এবার উৎপাদন কমার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় আখ ও চিনি জ্বালানি উৎপাদনে গেলে খাবারের জন্য চিনির সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে।
ইথানল উৎপাদনে আখের রস ও চিনির ব্যবহার কমিয়ে সরকার মূলত খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চাইছে। উৎপাদন কমার আশঙ্কার সময় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের ওপর দামের চাপ কমানো এ সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য।
জ্বালানি আমদানি কমানোর কর্মসূচিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
ভারত দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পেট্রলে ইথানল মেশানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে। দেশটিতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো পেট্রল, অর্থাৎ ই২০ ব্যবহারের নীতি জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছে।
কৃষিজাত কাঁচামাল থেকে তৈরি ইথানল পেট্রলের সঙ্গে মেশালে প্রচলিত জ্বালানির একটি অংশের বিকল্প তৈরি হয়, ফলে তেল আমদানির প্রয়োজন কমে। তবে ইথানল উৎপাদনে খাদ্যশস্য ও চিনির ব্যবহার বাড়লে খাদ্যপণ্যের সরবরাহে চাপ পড়তে পারে।
আখ থেকে ইথানল বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত ভারতের জ্বালানি নীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এখন ভুট্টা, উদ্বৃত্ত চাল, ভাঙা চাল ও মোলাসেসের মতো বিকল্প কাঁচামালের পর্যাপ্ততা, উৎপাদন ব্যয় এবং কারখানার সক্ষমতার ওপর ইথানল সরবরাহের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে। সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চিনির বাজার স্থিতিশীল রাখা, একই সঙ্গে ইথানল মেশানোর লক্ষ্য পূরণ করা।












