ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। অন্তত ৩৭ জন ভোটার নিজেদেরই মৃত দেখিয়ে তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছেন। অন্যদিকে, ৩৩৪ জোড়া ভোটার একে অপরকে মৃত ঘোষণা করে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে কর্ণাটকের ভোটার তালিকায় এসব অসংগতি ধরা পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডেট অ্যানালিটিকস অ্যান্ড কনসাল্টিংয়ের (ম্যাক ইনসাইটস) প্রক্রিয়াজাত উপাত্তে এসব ঘটনা উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তথ্যের অসংগতি ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি কীভাবে জটিলতা তৈরি করতে পারে, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিজেদেরই মৃত দেখিয়ে আবেদন
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-৭ ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়। কর্ণাটকে অন্তত ৩৭টি আবেদনে আবেদনকারী এবং যাঁর নাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে, দুজনের নাম একই ছিল। এমনকি নামের আদ্যক্ষরও মিলেছে। এসব আবেদনে নাম বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে ৩৩৪ জোড়া ভোটারের ক্ষেত্রে। প্রতিটি জোড়ার একজন অন্যজনকে মৃত দেখিয়ে নাম বাদের আবেদন করেছেন। পরে যাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, তিনিও পাল্টা আবেদন করে প্রথম ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়েছেন। প্রতিটি জোড়ার দুজনই একই ভোটকেন্দ্রের ভোটার। এসব ঘটনা কর্ণাটকের ২৫টির বেশি জেলায় ছড়িয়ে আছে।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পরও আবেদন
কর্ণাটকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম শুরু হয় ৩০ জুন। নিজেদের মৃত দেখিয়ে নাম বাদের অধিকাংশ আবেদন এর আগেই জমা পড়েছিল। তবে অন্তত তিনটি আবেদন জমা পড়ে খসড়া তালিকা প্রকাশের পর, ফলে ওই ব্যক্তিদের নাম খসড়া তালিকাতেও ছিল।
এ তিনটি ঘটনা ঘটেছে মাগাদি, সান্দুর ও ব্যাটারায়ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। আবেদনগুলো জমা দেওয়া হয়েছিল ১৭ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল কর্মকর্তা ও সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেছে।
প্রযুক্তিগত ত্রুটির ব্যাখ্যা
ব্যাটারায়ণপুর কেন্দ্রে ২৫ বছর বয়সী সুধা কে এনের নাম ফরম-৭-এ আবেদনকারী এবং যাঁর নাম বাদ যাবে, দুই জায়গাতেই লেখা ছিল। কারণ হিসেবে উল্লেখ ছিল মৃত্যু। সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল কর্মকর্তা জানান, প্রকৃতপক্ষে আবেদনটি ছিল শ্রীকান্ত নামের এক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য, যা তাঁর স্ত্রী সুধা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তালিকায় শ্রীকান্তের জায়গায় সুধা কে এনের নাম লেখা ছিল।
কীভাবে এই অসংগতি তৈরি হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি ওই কর্মকর্তা। তথ্য সংগ্রহের সময় সফটওয়্যারে ত্রুটি হয়েছিল, নাকি আগের তালিকাতেই ভুল ছিল, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন।
সান্দুর কেন্দ্রে ৩০ বছর বয়সী হনুমন্ত নিজের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ফরম-৭ জমা দেন, কারণ হিসেবে লেখা ছিল নিজের মৃত্যু। জ্যেষ্ঠ নির্বাচনী কর্মকর্তারা একে সফটওয়্যারের ত্রুটি বলেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল কর্মকর্তা জানান, ফরম-৭ জমা পড়ার বিষয়টি তিনি জানতেন না।
মাগাদি কেন্দ্রে মনীশ গৌড়া আর নামের এক ব্যক্তি ফরম-৭ জমা দেন। তালিকায় তাঁর ক্রমিক নম্বর ছিল ৪১৬, অথচ সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের ২৬৮ নম্বর অংশের খসড়া তালিকায় মোট ভোটার ছিলেন ৪১৫ জন।
বেলাগাভিতে সবচেয়ে বেশি পাল্টাপাল্টি আবেদন
পরস্পরকে মৃত ঘোষণার ঘটনা সবচেয়ে বেশি বেলাগাভি জেলায়, ১৬০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে কালাবুরাগি, ৮০টি। মহীশূর জেলায় এমন ২৮টি ঘটনার সবই ঘটেছে চামুণ্ডেশ্বরী বিধানসভা কেন্দ্রে।
সব ৩৩৪ জোড়া ভোটারের পাল্টাপাল্টি আবেদন জমা পড়েছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর। নির্বাচন কমিশন ১৪ মে এই কার্যক্রমের ঘোষণা দিয়েছিল। মাসভিত্তিক হিসাবে জুনে এমন আবেদন সবচেয়ে বেশি, ৩৩৩টি। কমিশন ১৬ জুন হালনাগাদের জন্য তালিকা স্থির করে এবং ৩০ জুন রাজ্যজুড়ে সংশোধন কার্যক্রম শুরু হয়।
ফরম-৭-এর তথ্যের সঙ্গে ফরম-১০-এর তথ্যও মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ফরম-১০-এ প্রতিদিন জমা পড়া ফরম-৭-এর আবেদনগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদন থাকে। এতে বেলাগাভির রায়বাগ এলাকার একটি ঘটনা সামনে আসে। ১৭ মে গঙ্গুবাই ভাদ্দার রুক্মিণী ভাদ্দারকে মৃত দেখিয়ে তাঁর নাম বাদের আবেদন করেন। একই দিনে রুক্মিণীও গঙ্গুবাইকে মৃত দেখিয়ে আবেদন করেন।
ঘটনাগুলো কর্ণাটকের ভোটার তালিকা সংশোধনে তথ্যের নির্ভুলতা, আবেদন যাচাই এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব অসংগতি ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি, নাকি প্রশাসনিক ভুল ও সফটওয়্যার সমস্যার ফল, তা নিশ্চিত হতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।












