ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং বিরোধীদের ওপর রাজনৈতিক প্রাধান্য। কিন্তু ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ছাত্রবিক্ষোভ সেই ব্যবস্থার সামনে এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যা শুধু সরকার পরিবর্তনের হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। প্রশ্নটি হলো, ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি এখনো নাগরিকদের সমান অধিকার ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারছে?
দিল্লিতে জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রথমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ ঘিরে গড়ে ওঠে। পরে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে তা আরও বিস্তৃত হয়। রাজধানীতে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নামেন। অন্য বড় শহরেও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের দাবি, ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
আন্দোলনটি মোদি সরকারের তাৎক্ষণিক পতনের হুমকি নয়। তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের তরুণেরা যখন একই দাবিতে একত্র হন, তখন তাঁদের সহজে কোনো একটি বিরোধী দলের অনুসারী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই বৈচিত্র্যই আন্দোলনকে বিশেষ শক্তি দিয়েছে।

সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি যখন প্রশ্নের মুখে
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নির্বাচন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। প্রথমটি নাগরিককে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার অধিকার দেয়, দ্বিতীয়টি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যে বিভক্ত একটি দেশে এই দুটি ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক বেশি। সম্পদ, পারিবারিক যোগাযোগ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যেখানে বহু ক্ষেত্রে সুযোগের অসম বণ্টন ঘটে, সেখানে ভোটের সমান মূল্য এবং পরীক্ষার নিরপেক্ষতা সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা।
কিন্তু এই নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব প্রশাসনিক সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
২০২৪ সালে ভারতের মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তির জাতীয় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এতে পরীক্ষা পরিচালনাকারী জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির কার্যক্রম নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্য ছিল দক্ষতা ও নিয়মশৃঙ্খলা বাড়ানো। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর দায়িত্বের কেন্দ্রীকরণ সমস্যার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর আরও স্পষ্টভাবে নিয়ে আসে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভের চাপে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাতে তরুণদের অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি। কারণ, তাঁদের উদ্বেগ শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল বা কোনো কর্মকর্তার ব্যর্থতা নিয়ে নয়। তাঁরা জানতে চান, ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখার মতো নিশ্চয়তা কোথায়?
ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগের গভীরতা
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার বিশেষ উদ্যোগও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, একাধিকবার অন্তর্ভুক্তি কিংবা অযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি দূর করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই কাজের পদ্ধতি যদি যোগ্য নাগরিকদেরই ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে ফেলে, তবে সংশোধনের উদ্দেশ্য আর তার বাস্তব ফলের মধ্যে গুরুতর ব্যবধান তৈরি হয়।
২০২৫ সালের জুন থেকে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, একাধিকবার থাকা নাম এবং দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের নাম রয়েছে। কিন্তু বহু নাগরিকের নাম বাদ পড়ায় তাঁরা ভোটাধিকার ফিরে পেতে জটিল আপিলপ্রক্রিয়ার মুখে পড়েছেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, নাম বাদ দেওয়ার কারণ যথেষ্ট স্বচ্ছ নয় এবং নাগরিকদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক বাধা তৈরি হয়েছে। নতুন সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে প্রচলিত যাচাইপ্রক্রিয়া ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সুপারিশ উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ার পর বহু মানুষ মার্চের রাজ্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, কারণ তাঁদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি। ওই নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে ক্ষমতায় আসে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ভোটার তালিকা সংশোধনকে নির্বাচন প্রভাবিত করার সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন।
তবে পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা আপিল নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণে যোগ্য নাগরিক ভোট দিতে না পারলেও গণতান্ত্রিক ক্ষতি ঘটে। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; শুধু তালিকা নির্ভুল করার দাবি সেই দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যাঁদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি, তাঁরা পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন—আদালতের এমন অবস্থান বর্তমান নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ হারানোর তাৎপর্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
মে মাসে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পরিবর্তনের দাবিতে আসা একদল তরুণ আইনজীবীকে ‘তেলাপোকা’ বলে তুলনা করার পর ক্ষোভ আরও বাড়ে। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রথমে ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে এবং পরে সংগঠিত প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গড়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সক্রিয়তা বাড়াতে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করতে সংগঠনটি ভূমিকা রাখে। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতেও এর সমর্থকেরা সক্রিয় হন।
এই ঘটনাগুলোর তাৎপর্য শুধু কোনো বিচারক বা কর্মকর্তার মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিবাদের ভাষাও বদলে যায়। তরুণেরা শুধু আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; ব্যঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনসমাবেশকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন।
মোদির রাজনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর দৃঢ় ও অপরাজেয় নেতার ভাবমূর্তি। সেই ভাবমূর্তি যখন প্রকাশ্য বিদ্রূপের মুখে পড়ে, তখন বিষয়টি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক রসিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অর্থ, ক্ষমতার প্রতি ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি অন্তত কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হচ্ছে।
এই আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর অংশগ্রহণকারীরা প্রচলিত বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাস বা পরিচয়ের সঙ্গে পুরোপুরি বাঁধা নন। পরীক্ষায় ন্যায্যতা এবং ভোটাধিকার—এই দুটি বিষয় দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে একত্র করতে পারে। ফলে আন্দোলনটিকে কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন।

মোদি কেন সহজে ছাড় দিতে চাইবেন না
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি সরকারের জন্য শুধু একজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন নয়। মোদি সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোয় আনুগত্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। সরকারের পক্ষে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নেতৃত্বের সমর্থন পাবেন—এমন ধারণা দুর্বল হয়ে গেলে দলের ভেতরেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া প্রকাশ্য চাপের মুখে ছাড় দেওয়াকে মোদি নিজের নেতৃত্বের দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা ভুল স্বীকারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে বিরোধীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং আরও দাবিতে আন্দোলন বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।
এই কারণেই সরকার বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দিল্লিতে ৪০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, মেট্রো ও রেলস্টেশন বন্ধ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যারিকেড, মোবাইল ইন্টারনেট স্থগিত এবং সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার ঘটনা সরকারের অবস্থানের কঠোরতা তুলে ধরে। বিরোধী দল ও তরুণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের প্রতি সমর্থন বজায় রাখাও সেই অবস্থানের অংশ।
তবে শক্তি প্রয়োগ করে রাজপথ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মানুষের আস্থার সংকট দূর করা যায় না। বরং যুক্তিসংগত দাবি আলোচনার বাইরে রেখে আন্দোলনকারীদের বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
মোদির সামনে রাজনৈতিক হিসাবটিও জটিল। আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিলে সরকারকে দুর্বল দেখাতে পারে; আবার দাবি উপেক্ষা করে কঠোর অবস্থানে অনড় থাকলে অসন্তোষ আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের সমাধান শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কারণ, সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে নাগরিকদের সংশয়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আন্দোলনের জ্বালানি
তরুণদের ক্ষোভের পেছনে শুধু রাজনৈতিক অধিকার নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগও রয়েছে। প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৩ শতাংশ। চলতি বছরে শ্বেতপোশাক খাতের চাকরির প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশে নেমেছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পরিসংখ্যান তাই তরুণদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সবটা ব্যাখ্যা করে না। তাঁদের কাছে শিক্ষা হলো চাকরি পাওয়ার সম্ভাব্য পথ, আর নির্বাচন হলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেওয়ার অধিকার। দুই ক্ষেত্রেই যদি ন্যায্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি হতাশা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ভারতের বিক্ষোভের সঙ্গে তুলনা টানার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, এবং বর্তমান আন্দোলন সরাসরি মোদি সরকারের পতন ঘটাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। জনঅসন্তোষ সব সময় নির্বাচনী সমর্থনে রূপ নেয় না। বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা ও বিভক্তি বিজেপিকে সুবিধা দিতে পারে।
২০২৭ সালের মার্চে উত্তর প্রদেশের রাজ্য নির্বাচন বর্তমান বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাব যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। বিজেপি সেখানে জয়ী হলে সরকার নিজের অবস্থান অটুট থাকার দাবি জোরালো করতে পারবে। পরাজিত হলে চলমান অসন্তোষের রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা আরও কঠিন হবে।
সরকারের সমর্থকেরা আন্দোলনকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে জনমত ঘোরানোর চেষ্টাও হতে পারে। বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগের উদাহরণ টেনে ভারতের বিক্ষোভকেও একইভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু আন্দোলনের পেছনে বাস্তব অসন্তোষ থাকলে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দিয়ে তা দূর করা যায় না। বাংলাদেশের ও নেপালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জনঅসন্তোষের গভীরতা উপেক্ষা করলে সরকার পরিস্থিতির প্রকৃত মাত্রা বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা—এই বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জবাবদিহি

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সরকার যদি নিজেদের প্রচারিত বক্তব্যকেই জনমতের পূর্ণ প্রতিফলন বলে ধরে নেয়। আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু তাতে ভোটাধিকার, পরীক্ষার নিরপেক্ষতা কিংবা কর্মসংস্থানের উদ্বেগের উত্তর পাওয়া যায় না।
গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে শুধু নির্বাচন আয়োজন যথেষ্ট নয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে, বাদ পড়া নাগরিকদের আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ জরুরি।
মোদির ক্ষমতা এখনই ভেঙে পড়ছে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। তরুণদের আন্দোলন সরকার পরিবর্তনের নিশ্চয়তা না দিলেও একটি মৌলিক সত্য সামনে এনেছে: নাগরিকেরা যখন মনে করেন তাঁদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের বাইরে থাকে না।
ভারতের গণতন্ত্রের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু রাজপথের বিক্ষোভ সামলানো নয়। বরং এমন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নাগরিকের ভোট, শিক্ষার্থীর পরীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত—সবকিছুর ওপর ন্যায্যতার বিশ্বাস বজায় থাকে।
এই আন্দোলনের ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। জনরোষ যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচনী পরিবর্তন ঘটাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিজেপি বিরোধীদের বিভক্তির সুবিধা পেতে পারে, আর সরকারও প্রশাসনিক কিছু ছাড় দিয়ে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না, যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার না হয়।
তরুণদের প্রতিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি নন। গণতন্ত্র বিপন্ন হলে নাগরিকের কাজ কেবল পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করা নয়; অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নে সক্রিয় থাকা।
ভারতের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য পথ। সরকার যদি প্রতিবাদকে কেবল দমনযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখে, তবে গণতান্ত্রিক পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে। আর যদি এই আন্দোলনকে নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সংকট থেকেই প্রতিষ্ঠান সংস্কারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু মোদি কত দিন ক্ষমতায় থাকবেন তার ওপর নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে পারবে তার ওপর। তরুণদের আন্দোলন সেই মৌলিক প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।













