মাঝ আকাশে দরজা খুলে যাওয়ার পর একটি ভারতীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে। রোববার দুপুর পৌনে ২টার দিকে উড়োজাহাজটি নিরাপদে নামে। তবে এতে থাকা রোগী আঞ্জনা ভৌমিককে বাঁচানো যায়নি। ৫৬ বছর বয়সী এই ভারতীয় নারীকে চিকিৎসার জন্য আগরতলা থেকে কলকাতায় নেওয়া হচ্ছিল। অবতরণের পর তাঁকে কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বিকেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
উড়োজাহাজটি ছিল বিচক্রাফট কিং এয়ার সি৯০এ মডেলের। এর নিবন্ধন নম্বর ভিটি-এইচওয়াইএ। এটি পরিচালনা করে ভারতের এসকেবি ইনফ্রাকন প্রাইভেট লিমিটেড। ফ্লাইটটি ছিল ভারতের ভেতরের, আগরতলা থেকে কলকাতা। প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার সময় উড়োজাহাজের দরজা আংশিক খুলে যায়। এরপর পাইলটেরা ঢাকার বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরুরি অবতরণের অনুমতি চান। আন্তর্জাতিক অবতরণের প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকলেও মানবিক বিবেচনায় উড়োজাহাজটিকে নামতে দেওয়া হয়।
উড়োজাহাজে মোট সাতজন ছিলেন। তাঁরা সবাই ভারতীয় নাগরিক। দুই পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন পুণ্য অনুপ ও ক্যাপ্টেন তনুজ শর্মা। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক ফিরোজ খান, প্যারামেডিক আজিম খান এবং রোগীর সঙ্গী শান্তা ভৌমিক। আরও একজন সঙ্গী ছিলেন দীপ জ্যোতি। রোগী ছাড়া বাকি সবাই নিরাপদে আছেন। দরজা খুলে যাওয়া আর রোগীর মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি এখন দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়েও গড়িয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সারার কাজ করছে।
ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আগরতলা বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা শহর। সেখান থেকে কলকাতার আকাশপথের বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যায়। ফলে এই পথে কোনো উড়োজাহাজ বিপদে পড়লে সবচেয়ে কাছের বড় বিমানবন্দর হয় ঢাকা। শাহজালাল দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত বিমানবন্দর। এখানে জরুরি অবতরণ সামলানোর মতো অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা আছে। এবারের ঘটনায় ঢাকার বিমানবন্দর দ্রুত সাড়া দিয়েছে। একটি ভারতীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এখানে নামতে পেরেছে। কাগজপত্রের জটিলতা থাকা সত্ত্বেও মানবিক কারণে অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কে এমন সহযোগিতা ইতিবাচক বার্তা দেয়। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথে দুই দেশের সমন্বয় কতটা জরুরি।
রোগীবাহী যেকোনো উড়োজাহাজে দরজা ও কেবিনের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় বিষয়। কারণ অসুস্থ মানুষের শরীর উঁচুতে বাতাসের চাপের পরিবর্তন সহজে সামলাতে পারে না। মাঝ আকাশে দরজা খুলে যাওয়া তাই খুবই গুরুতর ঘটনা। এ কারণে ভারতীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির কারিগরি দিক ভালোভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। কোন পর্যায়ে কী ত্রুটি হয়েছিল, তা জানা গেলে ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তায় এ ধরনের উড়োজাহাজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ তাই অত্যন্ত জরুরি। এমন ঘটনায় পাইলটের দ্রুত সিদ্ধান্ত আর কাছের বিমানবন্দরের প্রস্তুতি কতটা জরুরি, এবারের ঘটনা তা আবার দেখিয়ে দিল। আঞ্জনা ভৌমিকের পরিবারের জন্য চিকিৎসার এই যাত্রা শেষ হলো গভীর শোকে।












