বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা নেটফ্লিক্সের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিজ্ঞাপন থেকে আয় বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসা এবং জনপ্রিয় কনটেন্ট তৈরিতে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। বুধবার লেনদেনের একপর্যায়ে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়।
একসময় নেটফ্লিক্সকে বিনোদনশিল্পে প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক উদ্ভাবনের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন কোম্পানিটি নিজের অতীত সাফল্যের মানদণ্ডেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য নেটফ্লিক্সকে এগিয়ে রেখেছিল, সেগুলো ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে। ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে অধিগ্রহণের প্রচেষ্টায় সফল না হওয়াও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সাবস্ক্রিপশনের মূল্য বাড়ানো এবং পাসওয়ার্ড ভাগাভাগির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বাইরে নতুন প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে নেটফ্লিক্সকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপনের আয়েও প্রত্যাশিত গতি নেই
নেটফ্লিক্সের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিজ্ঞাপনভিত্তিক সেবাকে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তুলনামূলক কম দামের সাবস্ক্রিপশন পরিকল্পনার সঙ্গে বিজ্ঞাপন যুক্ত করে নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে বিজ্ঞাপন ব্যবসার সম্প্রসারণ প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হওয়ায় সেই পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
কোম্পানিটির আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র ছিল ভিডিও গেম। জনপ্রিয় গেম সিরিজ ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো’র কিছু শিরোনাম যুক্ত করার উদ্যোগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এ খাতে অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে নেটফ্লিক্স। কিন্তু এখন পর্যন্ত গেমিং ব্যবসা কোম্পানিটির সামগ্রিক আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি।
অন্যদিকে, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নেটফ্লিক্সের জন্য ক্রমেই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের তৈরি বিপুল পরিমাণ স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও সহজেই দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি এসব কনটেন্ট দর্শকদের সময়ের জন্য নেটফ্লিক্সের ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
এর পাশাপাশি স্কাইড্যান্সের অধীনে প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা বিনোদনশিল্পে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে। ফলে দর্শক ধরে রাখা, নতুন গ্রাহক সংগ্রহ এবং মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে নেটফ্লিক্সের ওপর চাপ বাড়ছে।
কনটেন্ট ও নেতৃত্বে পরিবর্তনের উদ্যোগ
পরিস্থিতি সামাল দিতে নেটফ্লিক্স কর্মীসংখ্যা ৬ শতাংশ কমিয়েছে এবং অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের দুই নির্বাহীকে পরিবর্তন করেছে। কোম্পানির সহপ্রধান নির্বাহী টেড সারানডোসের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য মূল ব্যবসায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া। এমন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র তৈরি করতে চায় নেটফ্লিক্স, যেগুলো দর্শকদের কাছে সেবাটিকে অপরিহার্য করে তুলবে।
কনটেন্ট বিভাগের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত পিটার রাইসকে ঘিরে কিছু বিশ্লেষক আশাবাদী। তাঁদের মতে, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নির্মাণে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং শীর্ষস্থানীয় সৃজনশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নেটফ্লিক্সের কনটেন্টের মান বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চমানের নির্মাণকাজে মনোযোগ বাড়ালে দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
সিটিজেনসের বিশ্লেষক ম্যাথিউ কনডনের মতে, রাইসের শিল্পসংশ্লিষ্ট যোগাযোগ নেটফ্লিক্সকে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে এবং তাঁদের ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ডাফার ব্রাদার্স, শন লেভি ও নোয়া বামবাখের মতো নির্মাতাদের সরে যাওয়ার পর এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া সরাসরি সম্প্রচারিত ক্রীড়া অনুষ্ঠান পরিচালনায় রাইসের অভিজ্ঞতা নেটফ্লিক্সকে উন্নত মানের ক্রীড়া অনুষ্ঠান ও সম্প্রচারে আরও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিতে সহায়তা করতে পারে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রাহকদের কাছে সেবাটির আকর্ষণ বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে সতর্ক বিশ্লেষকেরা
নেটফ্লিক্সের সর্বশেষ আর্থিক ফল প্রকাশের পর ২০টির বেশি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির শেয়ারের সম্ভাব্য মূল্য বা লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। বুধবারের দরপতন অব্যাহত থাকলে একদিনে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যবস্থাপনা কনটেন্টের মান উন্নয়ন এবং দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—এমন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র তৈরিতে মনোযোগ দিতে চায়।
তবে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের মূল্যায়নও বিনিয়োগকারীদের আলোচনায় রয়েছে। আগামী ১২ মাসের সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় কোম্পানিটির শেয়ার প্রায় ১৮ দশমিক ৩ গুণ দামে লেনদেন হচ্ছিল। একই হিসাবে ওয়াল্ট ডিজনির শেয়ারমূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৭৬ গুণ এবং কমকাস্টের ৬ দশমিক ২৬ গুণ। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় নেটফ্লিক্সের শেয়ারের মূল্যায়ন বেশি, ফলে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে শেয়ারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
নেটফ্লিক্সের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিজ্ঞাপন ব্যবসার গতি বাড়ানো, দর্শকদের পছন্দ অনুযায়ী আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি এবং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করা। নেতৃত্বে পরিবর্তন ও ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে কোম্পানিটি আবারও ধারাবাহিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র তৈরি করে দর্শক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, তার ওপর।












