বিদেশে গিয়ে কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের খরচের পরিমাণ দেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ডে ব্যয়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকেরা কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করেছেন প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা।
জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডে ব্যয় সামান্য বেড়েছে। জুলাইয়ে এ খরচ ছিল প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ডে ব্যয় জুলাইয়ের ২৩৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ২৪৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক মাসে এ ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেশের নাগরিকদের বিদেশে কার্ডভিত্তিক ব্যয়ের ব্যাপকতা তুলে ধরছে। বিদেশে বাংলাদেশিদের মোট কার্ড ব্যয়ের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে খরচ হয়েছে ৫০৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ডেবিট কার্ডে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি ১০ লাখ টাকা।
বিদেশে কোন দেশে কত ব্যয়
বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেনের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে দেশটিতে। এরপর রয়েছে থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত ও সিঙ্গাপুর।
ডেবিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল যুক্তরাজ্য। বিদেশে বাংলাদেশিদের ডেবিট কার্ডে মোট লেনদেনের ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ হয়েছে সেখানে। অন্যদিকে, প্রিপেইড কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল ভারত। এ ধরনের কার্ডে বিদেশে মোট ব্যয়ের ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে দেশটিতে।
দেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে
বিদেশে কার্ডে ব্যয় বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন কমেছে। জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
দেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। মোট লেনদেনের ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এরপর রয়েছে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, যেখানে ব্যয়ের অংশ ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ। ওষুধের দোকানে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং নগদ টাকা উত্তোলনে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ লেনদেন হয়েছে।
তবে সামগ্রিক লেনদেন কমলেও কয়েকটি খাতে ব্যয় বেড়েছে। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন জুলাইয়ের ৪৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ৫১৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া পরিষেবার বিল, ওষুধ ও ওষুধজাত পণ্য, পোশাক এবং পরিবহন খাতেও ব্যয় বেড়েছে।
পাঁচ বছরে কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে দেশে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৪২ লাখ, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৬৩ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ড ১০ লাখ ২৭ হাজার।
২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা হয়েছে ২৮ লাখ ৫ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯২ লাখ ৭১ হাজার।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে দেশে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। কার্ডের বিভিন্ন ধরনগুলোর মধ্যে প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে।
আগস্টের শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে অনুমোদিত মোট ঋণসীমা ছিল ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। কার্ডের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলা কিউআর কোডের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তঃসংযোগযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণেও কাজ চলছে।
দেশে কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার স্পষ্ট হচ্ছে। তবে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডে ব্যয় এবং দেশে বিদেশিদের কার্ডে ব্যয়ের বড় ব্যবধান আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও কেনাকাটায় দেশের নাগরিকদের ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।












