রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি ফেরার পথে প্রায় দুই হাজার পর্যটক আটকা পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় পর্যটকদের বহনকারী গাড়িগুলো রওনা হলেও পথে অবরোধের মুখে পড়ে। এতে পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সকাল ৯টার দিকে পর্যটকদের গাড়িগুলো সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাঘাইছড়ির উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়ে সেগুলো। ফলে মাঝপথেই আটকে যান পর্যটকেরা।
অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি আঞ্চলিক সংগঠন বুধবার সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দেয়। সংগঠন দুটি জানায়, বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অবরোধ চলবে। একই সঙ্গে বুধবারের মধ্যেই সব পর্যটককে সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অবরোধের ঘোষণার পর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। বুধবার সন্ধ্যায় জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে সবাইকে নিরাপদে সাজেক ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনার পর বৃহস্পতিবার সকালেই পর্যটকেরা সাজেক থেকে ফিরতে শুরু করেন। তবে যাত্রা শুরুর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে তাঁদের গাড়ি থেমে যায়।
সাজেক থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. কাওসার জানান, উজোবাজারে পর্যটকবাহী গাড়ি আটকে দেওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে পর্যটকদের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাজেকে পর্যটকবাহী গাড়ির পরিবহন সমন্বয়ক মো. ইয়াসিন জানান, সাধারণত সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে পর্যটকবাহী গাড়ি ছেড়ে যায়। তবে অবরোধের কারণে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় গাড়িগুলো রওনা করা হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় প্রায় দুই হাজার পর্যটক সাজেক ছাড়েন। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা না ঘটলে তাঁদের দুপুরের মধ্যে খাগড়াছড়ি পৌঁছানোর কথা ছিল।
সশস্ত্র সদস্য প্রত্যাহারের দাবি
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে সংগঠন দুটি। ওই সময় সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান অবরোধকারীরা।
আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত তিনটি দাবির মধ্যে একটি হলো সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের প্রত্যাহার। একই দাবিতে গত ১১ অক্টোবরও অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিল সংগঠন দুটি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জনসংহতি সমিতি। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা
অবরোধ ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সাজেকের স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়েছে। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যেতে হচ্ছে। অনেক পর্যটক আগে থেকে বুকিং দেওয়া রিসোর্টের সংরক্ষণও বাতিল করেছেন।
তিনি বলেন, সাজেকে সড়ক অবরোধ হলে শুধু পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, স্থানীয় বাসিন্দারাও বড় ধরনের দুর্ভোগে পড়েন। এ সময় স্থানীয়ভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অবরোধ কত দিন চলবে এবং আটকে পড়া পর্যটকেরা কখন নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে সাজেকের পর্যটন খাতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।












